যতো দূরে যাই নিজের কাছে ফিরি । কামরুল আহসান

0
Showing 1 of 1

মানুষ সারাজীবন ধরে একটা নির্দিষ্ট সার্কেলেই ঘোরে আর ভাবে সে বোধহয় কোথাও যাচ্ছে! কেন মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে যায়? কেন জাগে মনে স্থান পরিবর্তনের বাসনা, ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা? প্রথমত বস্তুগত প্রয়োজনের কারণে বটেই, প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যায়। আবার বস্তুগত প্রয়োজনও তো সব নয় মানুষের, নিতান্ত মনের শখেই সে পাড়ি দেয় দুরন্ত সাগর, দুর্গম মরুভূমি, গহীন অরণ্য, সুউচ্চ পাহাড় আর নাম না জানা কতো শহর বন্দর! রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন তার ঐকতান কবিতায়, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি/ দেশে দেশে কত-না নগর রাজধানী/ মানুষের কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু/ কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচত তরু/ রয়ে গেল অগোচরে/ বিশাল বিশ্বের আয়োজন, মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।
অজানাকে জানার বাসনাই মানুষকে ঘর থেকে বের করে, সাহস যোগায় অজানার পানে পা বাড়াতে। এডমুন্ড হিলারি যখন এভারেস্টর দিকে যাচ্ছিলেন তখন তাকে একজন জিজ্ঞেস করলেন, কেন যাচ্ছো ওখানে? হিলারি বলেছিলেন, কারণ, ওটা ওখানে আছে। বৈচিত্র্য আহরণ, সৌন্দর্য উপভোগের জন্যই মানুষ রোমাঞ্চকর অভিযানে যায়, তবে সব ভ্রমণই অভিযান নয়, যেমন সব বেড়ানোই ভ্রমণ নয়। স্বল্পদূরে পরিচিতি পরিমণ্ডলে ঘোরাফেরার নাম সম্ভবত বেড়ানো। আরেকটু দূরে গেলে, শহরের বাইরে বা দেশের বাইরে শুধুমাত্র মানসিক পরিচর্যা বা সৌন্দর্য উপভোগের নাম ভ্রমণ। যেখানে কোনো কাজ থাকবে না, হাত-পা ঝারা অবস্থায় শুধু খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, ঘুরে বেড়ানো। বেশির ভাগ ভ্রমণই নিছক আনন্দ লাভ, মানসিক ক্লান্তি দূর করার একটা সাধারণ প্রক্রিয়া। একজায়গায় থাকতে থাকতে মানুষ মানসিক ক্লান্তিতে আক্রান্ত হয়। কেন আসে এ মানসিক ক্লান্তি? ব্যাপারটা মনস্তাত্ত্বিক বটেই। আসলে সব ভ্রমণই এক প্রকার পলায়ন। এক জায়গায় আবদ্ধ থাকতে থাকতে মানুষের মনে কিছু জট পাঁকিয়ে যায়। শুধু কর্মভার নয়, মানুষকে বহন করতে হয় নানারকম সম্পর্কের বোঝা। প্রতিটা সম্পর্কেই আমাদের কিছুটা ইগো জড়িত থাকে, নানারকম হিসেব-নিকেশ। তখন হঠাৎ মনে হয়, যাই পরিচিত জগত ছেড়ে একটু ঘুরে আসি; এবং মানুষ যতো দূরে যায় ততো আসলে নিজের কাছে ফিরে। এর কারণ হচ্ছে সে আসলে নিজের ইগোর জগত থেকে বেরিয়ে যায়, যতো দূরে যায় অহমের সুতো ততো ঢিলে হতে থাকে, এক সময় সে শুধু নিজের মুখোমুখি হয়। যেখানে কোনো কর্মভার নেই, পরিচিত মুখের ক্লান্তি নেই, কারো কাছে কোনো হিসেব-নিকেশের বালাই নেই, কেবল আমি আর আমার প্রকৃত সত্তা; দুজনে মুখোমুখি, সামনে অবারিত প্রকৃতি, প্রকৃতির মধ্যে বিলীন হয়ে গেলেই মানুষ নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে, জটবাঁধা সুতোগুলো একটি একটি করে খুলতে থাকে। তাই ঘুরেফিরে আসার পর মানুষকে এতো সতেজ দেখায়। সম্পর্কগুলো আবার নতুন করে সজীব হয়ে ওঠে। কর্মজীবনেও লাগে নতুন প্রাণের ছোঁয়া
প্রায় সব মানুষই ভ্রমণ করতে ভালোবাসে। কিন্তু কেন মানুষ ভ্রমণ করতে ভালোবাসে? বিভিন্ন কারণেই মানুষ ভ্রমণ করে। কাজের প্রয়োজনে, জ্ঞান-অর্জনের জন্য, নিছক সৌন্দর্য-দর্শনের জন্য। কিন্তু, ভ্রমণ আসলে তার চেয়েও বড় ব্যাপার। ভ্রমণ শুধু রোমাঞ্চকর অভিযান নয়, ভ্রমণ একপ্রকার শিল্পকলা। অ্যালেন ডি বটন বলছেন, ভ্রমণ হচ্ছে শিল্পকলার শিল্পকলা। কারণ ভ্রমণের মধ্য দিয়েই জাগ্রত হয় মানুষের সুপ্ত সত্তা।
অ্যালেন ডি বটন এ সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন দার্শনিক। জন্ম সুইটজারল্যান্ডের জুরিখে ১৯৬৯ সালে। তিনি মূলত দার্শনিক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। কীভাবে মানুষ সুখী হতে পারে, কীভাবে জীবন ও জগতের সঙ্গে খাপখাওয়াতে পারে, বৈষম্য কমিয়ে কীভাবে একটা সমতার পৃথিবী গড়ে তোলা যায় এইসব তার আলোচনার বিষয়। ১৯৯৩ সালে তিনি লিখেন ভালোবাসার ওপর একটি প্রবন্ধ, ‘অন লাভ’। বইটি এ পর্যন্ত ২ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। তার আরেকটি বিখ্যাত বই হচ্ছে কীভাবে প্রুস্ত আপনার জীবনকে পরিবর্তন করে দিতে পারে (How Proust Can Change Your Life (1997)| তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে আছে The Consolations of Philosophy (2000), The Architecture of Happiness (2006)।
The Art of Travel অ্যালেন ডি বটনের আত্ম-আবিষ্কার বিষয়ক তৃতীয় প্রকাশিত বই। বইটি বেরিয়েছিল ২০০২ সালে। প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বইটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। শখের ভ্রমণপিপাসুদের চেয়ে বইটি বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে শিল্পবোদ্ধাদের। এ বইতে বটন খুঁজেছেন কেন মানুষ ভ্রমণ করতে যায়? ভ্রমণ করতে গিয়ে সে কী পায়?
সাধারণত ভ্রমণকাহিনিগুলো মানুষকে এই বলেই উদ্বুদ্ধ করে কোথায় ঘুরতে যাবেন, ঘুরতে গিয়ে কী কী করবেন? কিন্তু, বটন জানিয়েছেন, কেন আপনি ঘুরতে যাবেন এবং কীভাবে ঘুরবেন। বটন এই বিষয়ে বিখ্যাত শিল্প-সাহিত্যিকদের সাহায্য নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, এডওয়ার্ড হোপারের কবিতা থেকে আমরা শিখি গ্যাস ইস্টিশন আর আধেক খালি ক্যাফেতেও কীভাবে সৌন্দর্য ছড়িয়ে থাকে। গুস্তাভ ফ্লুবার্টের লেখা পড়ে আমরা জানতে পারি ঘর কেমন ভয়ঙ্কর হয়ে যায় একদিন। তখন আমাদের ঘর ছেড়ে পালাতে হয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ আমাদের সামনে এক অদেখা প্রাকৃতিক ভূমি উন্মোচন করে দেন। ভ্যান ঘগ, কাসাপার ডেডিভ ফ্রিডরিকের মতো শিল্পীরা সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের এঁকে দেখিয়েও দেন। আমরা তাদের দেখানো পথ ধরে হাঁটতে পারি, আবিষ্কার করতে পারি আরো নতুন কিছু। এ কথা সত্য, ভ্রমণ না করলে বিভিন্ন দেশের শিল্পও ভালো করে বোঝা যাবে না। ভ্রমণ আমাদের কৌতূহলী করে, সতর্ক করে আর প্রকৃতির সঙ্গে এক করে; ফলে আমাদের মানসিক ভারসাম্য আসে।
বটন বইটি লিখেন নিজের জীবনের ছোট্ট একটি ঘটনা থেকে প্রভাবিত হয়ে। একবার তিনি বারবাডোসে ঘুরতে গেছেন একা। একজন কলিগের যাওয়ার কথা ছিল তার সাথে। কিন্তু, পরে আর তিনি যেতে পারেননি। সেটা ভালোই হয়েছিল। বটন একা একা ঘুরতে ঘুরতে একটা মজার জিনিশ আবিষ্কার করেন। এক রেস্টুরেন্টে প্রেমিক-প্রেমিকা পুডিং নিয়ে খুব ঝগড়া করছে। এটা তাকে খুব ভাবালো, ঘুরতে এসেও তারা ঘরে থাকার মতো এমন বিশ্রী ঝগড়া করে কেন? বটন আবিষ্কার করলেন, আসলে তারা ভ্রমণের প্রকৃত শিল্পকলা জানে না। তাই তারা ঘুরতে এসেও ঘরের বিশ্রী অভ্যাসগুলো সঙ্গে করে নিয়ে আসে।
ভ্রমণ এখন সবচেয়ে বড় বাণিজ্য। এটা এমনকি অস্ত্র ও ওষুধশিল্পকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। শুধু ভ্রমণকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বিশাল ট্রাভেল এজেন্সি, অসংখ্য হোটেল, রেস্টুরেন্ট, শপিং সেন্টার। কিন্তু, ভ্রমণের আসল কারণই যেন দিন দিন আড়ালে চলে যাচ্ছে। আত্ম-আবিষ্কারের চেয়ে ভ্রমণ হয়ে উঠছে আত্মপ্রচারণার একটা মাধ্যম। এটাই বটন দেখাতে চেয়েছেন তার বইজুড়ে।
দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়া আর ব্যক্তিগত ভ্রমণের মধ্যে পার্থক্য আছে। বেশির ভাগ মানুষ দূরে কোথাও ঘুরতে যায় দলবেঁধেই। হয়তো বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পরিবারের লোকজনের সাথে। সেখানেও থাকে নির্বাচিত কিছু মানুষ। কারণ, এই উক্তিটি আমরা সবাই জানি, ঘুরতে যাও সমমনা মানুষের সাথে, অথবা একা। দলবেঁধে ঘুরতে যাওয়া বেশির ভাগই হয় অবকাশ যাপন, আড্ডাবাজি। রোমাঞ্চকর আবিষ্কার সেখানে কমই থাকে। পরিবার নিয়ে তিনদিন কক্সবাজার হোটেলে থেকে আসাকে আর যাই হোক ভ্রমণ বলা যায় না। ভ্রমণে অবশ্যই অজানাকে জানার একটা তাড়না, প্রেরণা থাকতে হবে।
বাঙালি ভ্রমণপিপাসু জাতি না। আদিকাল থেকেই সে গৃহকোণে আবদ্ধ। বাইরের পৃথিবীকে সে চিনেছে অল্পই। তাই তার মনে এতো ভয়, এতো হীনমন্যতা। বাঙালির ভ্রমণসাহিত্যও ততো উন্নত নয়। ভ্রমণ নিয়ে যা কিছু বলার বলেছেন ওই সবেধন নীলমণি এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই। তিনি প্রায় বিশ্বপরিভ্রমণ করেছিলেন, আর তা নিয়ে প্রচুর লিখেছেনও। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশ-বিদেশে’ বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যের এক অসামান্য নিদর্শন। অন্নদাশংকর রায় এবং বুদ্ধদেব বসুও বেশ কয়েকটি ভ্রমণগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং হুমায়ূন আহমেদের ভ্রমণকাহিনিগুলোও তরুণ পাঠকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। ভ্রমণসাহিত্যের একটা চল অধুনা চালু হয়েছে বলা যায়। এখনকার অনেক আমলা-সচিবও প্রচুর ভ্রমণ করেন, ভ্রমণ বলতে তারা বিদেশে যাওয়াটাই বোঝান অবশ্য। সেসব নিয়ে বিস্তৃত আকারে ফেনিয়ে-ফাঁপিয়ে লিখেনও অনেকে। সেগুলো বেশির ভাগই ব্যক্তিগত রোজনামচা। একপ্রকার ভ্রমণগাইড বলা যায়, সেখানে বর্ণিত স্থান-কালের জীবন-প্রকৃতির সৌন্দর্য ও গভীরতা খুঁজে পাওয়া যায় কমই। কোনো একটা ভ্রমণকাহিনি পড়ে যদি কোনো এক অদেখা নগর, অজানা জনপদের ছবি চোখের সামনে উন্মোচিত না হয় সেটাকে আর যাই হোক ভ্রমণকাহিনি বলা যায় না। তারপরও খুঁজলে এ সময়ের কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেরই উল্লেখযোগ্য কিছু ভ্রমণকাহিনি পাওয়া যাবে। নির্মলেন্দু গুণের ‘এবং প্যারিস’, এবং বেলাল চৌধুরীর ‘নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়’ অসামান্য দুটো ভ্রমণকাহিনি। নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায় অবশ্য বেলার চৌধুরীর আত্মজীবনী। কিন্তু তার সারাজীবনটিই ছিল বস্তুত একটি ভ্রমণ। সম্প্রতি বুলবুল সরওয়ার এবং শাকুর মজিদ ভ্রমণকাহিনি লিখেই বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
আমি অবশ্য ভ্রমণসাহিত্য নিয়ে এ লেখা লিখতে বসিনি। আমি চেয়েছিলাম ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা, দার্শনিকতা ও এর পেছনের মনস্তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করতে। ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন অবশ্য সারাপৃথিবীই আমাদের হাতের মুঠোয়। চাইলেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের দৃশ্য চট করে চোখের সামনে দেখে ফেলতে পারি। কিন্তু স্বশরীরে যাওয়া আর ছবিতে দেখার মধ্যে অবশ্যই বিরাট একটা পার্থক্য আছে। প্রতিটা স্থানেরই আলাদা গন্ধ ও রঙ আছে। কোথাও যাওয়া মানে শুধু সেখানকার কিছু তথ্য আহরণ নয়, সেখানকার খাদ্য জিভে চেটে দেখা, সেখানকার বাতাস গায়ে মাখা, সেখানকার ফুল-ফল-ফসলের ঘ্রাণ বুক ভরে টেনে নেয়া, সেখান মানুষ ও পরিবেশ-প্রকৃতির সঙ্গে একেবারে গায়েগতরে মিশে যাওয়া, তবেই না ভ্রমণ!
এখনকার তরুণপ্রজন্ম অবশ্য প্রচুর ভ্রমণ করতে চায়। ফাঁক পেলেই তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। এই বাংলাদেশেরই অনেক অজানা স্থান তারা খুঁজে বের করছে। বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ, কিন্তু, ভ্রমণের জন্য বৈচিত্র্যপূর্ণ। প্রতিটা ঋতুতে এদেশের হাওর-বিল-নদী-বনানীর চিত্র বদলে যায়। এ দেশের অবারিত প্রান্তর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এদেশের একেকটা অঞ্চলে একেকরকম সংস্কৃতির বিকাশ হয়েছে। অসংখ্য পালা-পার্বণ-লোকসংস্কৃতি এ দেশের প্রকৃতি ও ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গী মিশে গেছে। এ দেশের শিল্পসাহিত্যেও এ দেশের প্রকৃতির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। প্রকৃতিও যেন এ দেশের সাহিত্যের স্বতন্ত্র্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণ এক চরিত্র। আলাদা করে বলতে গেলে স্বতন্ত্র্য এক প্রবন্ধই দাবি করে। তবে জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার কথা না বললেই নয়। বাংলার রূপ আবিষ্কার করতে চাইলে রূপসী বাংলা পড়া অনিবার্য। কিংবা, বাংলার রূপ চোখে না দেখলে রূপসী বাংলা পড়ে কেউ বুঝতে পারবে না। যেজীবনে পাট পচা গন্ধ শুঁকেনি, আকন্দ-ধুন্দুল চোখে দেখেনি, দোয়েল-ফিঙে-শ্যামাপাখির ডাক শুনেনি, সে কী করে বুঝবে রূপসী বাংলার সৌন্দর্য! সাহিত্য-শিল্প-ভ্রমণ এ জন্য পাশাপাশি বাস করে। একটা ছাড়া আরেকটা অসম্পূর্ণ। ভ্রমণের শেষ উদ্দেশ্য মূলত সৌন্দর্য উপভোগ। পাঠেরও তাই। পাঠও মূলত এক ভ্রমণ। ভ্রমণও মূলত একরকম পাঠ।
মানুষের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সে আসলে প্রতি মুহূর্তে আরো গভীরতর সুন্দরকে আবিষ্কার করতে চায়। মানুষ এই জন্যই মানুষ কারণ সে অজানাকে জানতে চায়। এর জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করতেও সে পিছপা হয় না। কতো মানুষ কতো অভিযানে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে তার কোনো হিসাব-নিকাশ আছে? এভারেস্ট জয় করতে গিয়ে ১৯২২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মারা গেছেন ২৯২ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশি একজনও আছেন, মোহাম্মদ খালেদ হোসেন। তিনি ২০১৩ সালের মে মাসে এভারেস্ট জয় করে ফেরার পথে মৃত্যুবরণ করেন। এমন আরো কতো মানুষ মারা গেছেন সাগর-পাহাড়-অরণ্য-মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে, সেই আদিমকাল থেকে তার হিসেব আমরা কোনোদিনই পাবো না। শুধুমাত্র অজানাকে জানার বাসনাই তাদের নিয়ে গেছেন মৃত্যুর দিকে। এমন মানুষের কথা আমরা জানি যে একাই পাড়ি দিয়েছে বিশাল এক সমুদ্র, বিশাল এক মরুভূমি। অভিযানের কথা আসলেই আমাদের বেয়ার গ্রিলসের কথা মনে আসে। দুর্গম বন-মরু-প্রান্তরে একা একটি লোক বেঁচে থাকার জন্য কী সংগ্রামটাই করে! এ হয়তো দুর্ঘটনাবশত একা কোথাও আটকা পড়ে গেলে বেঁচে থাকার একটা চেষ্টা। কিন্তু, এমন লোকও তো আছে নিছক শখ করেই ভয়ঙ্কর অভিযানে বেরিয়ে যান একা। সাধারণ বোধবুদ্ধির লোক তার কাণ্ডকারখানা শুনলে হয়তো ভাববে, কেন তারা এমন করে, কেন ওদিকে যায়, কীসে কামড়ায়!
ইকারুস যখন তার বাবার সঙ্গে মোমের পাখায় ভর করে গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসছিল তখন ইকারুসের বাবা তাকে নিষেধ করেছিল, এতো উপরে উঠো না, সূর্যের খুব কাছে যেয়ো না, তাহলে তোমার মোমের পাখা সূর্যের উত্তাপে পুড়ে যাবে। কিস্তু, ইকারুস বাবার কথা শুনেনি। উড়তে উড়তে সে এতোটা উপরে উঠে যায় যে তার মোমের পাখা গলে যায়, আর সে পতিত হয় সমুদ্রে, সমুদ্রে ডুবে সে মারা যায়। ইকারুস কি বোকা ছিল? কেন সে বাবার কথা শোনেনি? আসলে এটাই হচ্ছে মানুষের আসলপ্রকৃতি, সে প্রতি মুহূর্তে তার সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায়।

পাঠপ্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য
Showing 1 of 1
Share.

Comments are closed.