তিনটি অণুগল্প । রফিক জিবরান

0
Showing 1 of 1

তিনদিকে পানিবেষ্টিত হাওর অঞ্চলের নয়টি গ্রাম নিয়ে শেয়ালমুখী দ্বীপ। গোটা শেয়ালমুখী দ্বীপের মানুষের বিশ্বাস জোহরা জ্বীন পোষে এবং জ্বীনের সাহায্যে সে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল বা দমন করতে পারে।

নয়পথী মোড়ের শেষ কোণায় একটি টিনের চালাঘরে জোহরার বাস। জোহরা ইতিহাসের লুকায়িত পাতা থেকে বারুদ সংগ্রহ করে আর খায়। এবং হয়তো, অপেক্ষাও করে।

আমরা কেবল জানি, জোহরা জ্বীন পোষে আর আগুন খায়।

‘ডাচরা সময়ানুবর্তিতা ভালোবাসে’—হোটেল কাউন্টারের মেয়েটা কাউকে হয়তো কথাটা বলল। কিন্তু দেখলাম আশপাশে আর কেউ নেই। সন্দেহ হলো আমাকেই কথাটা বলল কী-না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে জিজ্ঞেস করবো কি-না ভাবতে ভাবতে দেরি হয়ে গেল। তবে আমাদের ঘড়ির পাঁচ বা সাত সেকেন্ড পর মেয়েটি মুখ তুলল। একটা কৃত্রিম হাসি মাখানো মুখে আমার দিকে তাকাল আর সাথেসাথেই তার রোবট-ঠোঁট জোড়া কেঁপে উঠল, ‘হল্যান্ডে স্বাগতম!’

আমি তাকে বলতে চাচ্ছিলাম ‘সময় একটা কাল্পনিক প্রতিজ্ঞা এবং যে-কোনো কাল্পনিক ভাব বা প্রতিজ্ঞার অধীনতা মেনে চলার বিষয়ে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।’

তখন এরকমই কিছু একটা ভেবে থাকতে পারি, এখন অতটা নিশ্চিত নই। কেননা আমার ভাবনা নদীর মতোই নিত্য বদলায় বলে সবচেয়ে কাছের বন্ধুরাও অনুযোগ করে।

অবশ্য কাছের বন্ধু কখনো কেউ ছিল কি-না বলা মুশকিল। কেননা ‘কাছের’ শব্দটা বেশ গোলমেলে। তবে, নদীতীরে বহমান স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবি অপেক্ষায় থাকাটাই হয়তো প্রেম বা বন্ধুত্ব।

সময়ানুবর্তিতা এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক।

পুরাতন তেঁতুল গাছটির নড়াচড়া চোখে না পড়লেও গাছটির বাঁকানো শরীর রিহানার মনে গভীর ছাপ ফেলে। প্রতিদিন যাকে দেখা হয়, ছোঁয়া হয়, যার উপস্থিতি নিত্য বর্তমান—তেমন বস্তু বা চরিত্রকে প্রকাশ্যে অবজ্ঞা করা গেলেও মনের অদৃশ্য; অন্তর্গত নদীর প্রবাহে তার পলিমাটি জমা হতে থাকে। সেখানে ফল ও ফুলের চাষাবাদও হতে পারে।

রিহানার মনের সাথে তেঁতুল গাছটির ছোট ছোট পাতা এবং শক্ত অথচ মজবুত ডালগুলোর প্রাণের স্ফুরণ বিনিময় হয়।

মানুষের মন কত বিচিত্র, কখনো রঙিন, কখনো ধোঁয়াশা। কখনো মনে হয় চিনি তারে, আমি তারে চিনি—রিহানা ভাবে। নিজেকেও অনেক রহস্যময় লাগে।

নিজের চিন্তার থই নিজেই খুঁজে পাই না! মনের তল তবে পাবো কীভাবে?

দীর্ঘ ও তীব্র গরমকাল পেরিয়ে আজ বৃষ্টির ফোটার সাথে চলছে বিজলির চমক। রিহানার বিয়ের তিনমাস হতে চললো। ‘পুরুষরা নারীদের ক্ষুধা নিবারণের মেশিন না’—রিহানার আচমকাই কথাটা মনে হলো।

স্বামী মানুষটা গড়পড়তার চেয়ে ভাল, কিন্তু রিহানার চাহিদা সহজে মেটে না। এ জন্য কাউকেই দোষী করা যায় না। ক্ষুধা এক জৈবিক চাহিদা, উপরের তিনি বা রিহানা কেউই কী এ জন্য দায়ী?

রিহানা আরও কিছু বলতে চায়। কিন্তু তেঁতুল গাছের সাথে আলাপ ভালো লাগছে না আর।

অধীনতা না মেনে নেয়া থেকেই স্বাধীনতার শুরু—মরানদী থেকে প্রবাহমান নদীতে সাঁতার—রিহানার মন বিচিত্র জগতে ঘুরে বেড়ায়।

তেঁতুল গাছটির দিকে এখনো গভীর মমতায় তাকিয়ে আছে রিহানা। গাছটি হয়তো কিছু একটা বলছে, কিন্তু তার ভাষা রিহানা বুঝতে পারছে না।

রিহানা এখন কী করবে?

প্রচ্ছদ । অর্ণব পাল সন্তু

পাঠপ্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য
Showing 1 of 1
Share.

Comments are closed.