মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন বাঙালির মহত্তম অর্জন। বাঙালির জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা সুদূরপ্রসারী এবং তাৎপর্যবহ। সিপাহি বিদ্রোহ, নানকার বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ যেমন ভাস্বর হয়ে আছে বাঙালির মানসপটে, তেমনি রয়েছে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় সুমহান আত্মত্যাগের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়েই ক্ষুব্ধ, অগ্নিগর্ভ সমাজসত্তার শিল্পিত আত্মপ্রকাশের পথ সুপ্রশস্ত হয়েছিল। ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ বাঙালি অধ্যুষিত ভূখণ্ডের সমাজমানসে এক অন্তঃশীলা দুঃখদহন আছড়ে পড়েছিল। বাঙালির দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের যে বিকৃত রূপ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে প্রকাশিত হয়, স্বাভাবিকভাবেই তা সংবেদনশীল মননে অনিবার্য করে তোলে গভীরতর ক্ষরণ। ফলে, জাতিসত্তা সন্ধানের প্রশ্নটি নতুন রূপে প্রকাশের পথকে এগিয়ে নেয়। ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে প্রগতিপরায়ণ কবিমানস যে শিল্পশক্তি অর্জন করে তা থেকেই সূচিত হয় বাংলাদেশের কবিতার এক নতুন যাত্রা। এই শৈল্পিক উত্তরণ পাকিস্তানি স্বৈরশাসন বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। এই শৈল্পিক বিপ্লব একাত্তরের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে সাম্প্রতিক সময়েও বহমান। সঙ্গতকারণেই নতুন প্রজন্মের জন্য বাঙালির জীবন ও সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের অবদান মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।
পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে কবিরা সমাজ ও রাজনীতি-মনস্কই কেবল হয়ে ওঠেনি, তাদের মানসও ঋদ্ধ হয়েছে আন্তর্জাতিকতাবোধে। কবিতার উপকরণ, ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ, পরিপ্রেক্ষিত, জীবনলোক, ঐতিহ্যসূত্র, পুরাণের জগৎ অপরিবর্তিত থাকলেও যুদ্ধ এবং ধ্বংসকাণ্ড কবির আত্মপ্রকাশের প্রকৃতিতে ঘটায় বড় ধরনের রূপান্তর। বাঙালি জীবনের স্মরণীয়, ত্যাগ ও আলোকিত অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়েও বাঙালি কবিমানসে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের এই লড়াই যেমন ছিল আনন্দের, তেমনি বেদনাবিধূর। যুদ্ধের বাস্তবতায় কবিরা কাব্যোপকরণের প্রশ্নে প্রায় অভিন্ন বিন্দুতে এসে মিলিত হন। একটা সামাজিক চরিত্রও বাংলাদেশের কবিতা এ-সময়ে অর্জন করে। কবিতায় ব্যক্তিরুচির পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সংরক্ত চেতনা, নবগঠিত রাষ্ট্র ভাবনা এবং স্বপ্ন সামষ্টিক চরিত্র নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। কবিরা প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে সামাজিক ঐক্য সুসংহত রাখতে শব্দযুদ্ধে সামিল হন। জসীম উদদীন, সুফিয়া কামাল, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, আবুল হাসান, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, হুমায়ুন আজাদ, অসীম সাহা, সাযযাদ কাদির প্রমুখ কবি যুদ্ধের সংরক্ত চেতনা ধারণ করেই কাব্যকলা সৃষ্টিতে ব্রতী হন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত কবিতায় অবলীলায় উঠে এসেছে বাঙলার দামাল ছেলেদের বীরত্বগাথা। উঠে এসেছে সন্তান হারানো মায়ের অশ্রুবর্ষণের কথকতা। কবির শব্দবন্ধ ধারণ করেছে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মমতা। তীব্র ঘৃণা ছুঁড়ে দেয়া শব্দযুদ্ধের পাশাপাশি অনেক কবি অস্ত্রহাতে মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় হয়েছেন। জসীম উদদীন তার ‘দগ্ধগ্রাম’ কবিতায় যুদ্ধকালীন বাস্তবতা চিহ্নিত করেছেন এভাবে—
‘কী যে কী হইল পশ্চিম হতে নরঘাতকেরা আসি
সারা গাঁও ভরি আগুনে জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি।
মার কোল থেকে শিশুরে কাড়িয়া কাটিল যে খান খান
পিতার সামনে শিশুরে কাটিল করিল রক্ত স্নান।
কে কাহার তরে কাঁদিবে কোথায়, যূপকাষ্ঠের গায়
শত সহস্র পড়িল মানুষ ভীষণ খড়গ ধায়’
জসীম উদদীনের কবিতায় স্থান পেয়েছে বাঙালির ওপর পাকিস্তানি নরঘাতকদের সীমাহীন অত্যাচারের স্বরূপ। আবার আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘মাগো, ওরা বলে’কবিতায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ছেলের প্রতীক্ষায় মায়ের আত্মবিলাপ এবং একই সঙ্গে অপেক্ষার তীব্র আকুতি চিত্রায়িত হয়েছে।
‘কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা, সজনে ডাঁটায় ভরে গেছে গাছটা, আর, আমি ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি— খোকা তুই কবে আসবি! কবে ছুটি?’ চিঠিটা তার পকেটে ছিল, ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা। ‘মাগো, ওরা বলে, সবার কথা কেড়ে নেবে তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না। বলো, মা, তাই কি হয়?’
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় উপস্থাপিত এক মা যেন হয়ে উঠেছেন সর্বংসহা বাঙলা জননীর সার্থক প্রতিনিধি। কবিরা এভাবে শুধু বাঙালিকে নয়, বিশ্ববিবেকও জাগিয়ে তুলেছিল। নিরীহ বাঙালির ওপর পাক হানাদার বাহিনীর নির্মমতার খবর, কবিতা ও গান বিশ্ব মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের বিবেকবান মানুষকেও প্রতিবাদে সোচ্চার করেছিল। ফলে বাঙালি কবিদের পাশাপাশি বিশ্বকবিতায়ও ঠাঁই পেয়েছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। ফলশ্রুতিতে মার্কিন কবি অ্যালান গ্রিন্সবার্গ ‘যশোর রোড অন সেপ্টেম্বর’ শিরোনামের কবিতায় যুদ্ধকালীন বাঙালির দুর্ভোগের চিত্র বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন—
‘শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত মানুষের দল,
যশোর রোডের দুধারে বসত বাঁশের ছাউনি কাদামাটি জল।
কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে।
ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ি দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হায় একাত্তর যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।’
অন্যদিকে বাঙালির অকৃত্রিম বন্ধু, শিল্পী জর্জ হ্যারিসনের ‘ও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ’শীর্ষক গানে ভয়াবহতায় নিমজ্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মৃত্যুঞ্জয়ী আত্মত্যাগের মহিমা কীর্তন করা হয়—
‘হাজার হাজার সহস্রলোক মরছে ক্ষুধায়
দেখিনি তো এমন নির্মম ক্লেশ
বাড়াবে না হাত বল ভাইসব, কর অনুভব
বাংলাদেশের মানুষগুলোকে
ও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ, এত দুর্দশা
এ যন্ত্রণার নাই কোনো শেষ
বুঝিনি তো এত নির্মম ক্লেশ’
বলার অপেক্ষা রাখে না, একাত্তরে বাঙালি হৃদয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনা, স্বদেশপ্রেম এবং মানবতাবাদী আবেগের যে স্ফূরণ ঘটে তা কবিতার বিষয় ও আঙ্গিকে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। কবিদের স্বদেশ এবং জীবনলগ্নতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে শব্দবন্ধে। যুদ্ধ-উত্তর পর্বেও সাহিত্যের প্রতিটি শাখা পূর্ণ হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ উপজীব্য করে।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ‘সাহিত্যের আর এক নাম জীবন সমালোচনা। জীবনসত্যের বিশ্লেষণই এতে অঙ্গীকৃত। মানুষের আবেগ ও মননের মাধ্যমে জীবনের সত্য, জীবনাতীতের সত্য ভাষার সৌন্দর্যে মণ্ডিত হয়ে সাহিত্যে উদ্ভাসিত হয়।’ সাহিত্যের দর্পণে যদি প্রতিবিম্বিত হয় একটি জাতি তথা একটি রাষ্ট্রের জীবন প্রণালী, প্রতিফলিত হয় সেই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি। তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়েও বাঙালি জাতির আপোসহীন সত্তা সহজেই শনাক্তযোগ্য হয়ে ওঠে।
ক. আমার বুকের রক্তে বাংলার শ্যামল প্লাবিত
যেন কোন সবুজাভা নেই আর, সকল সবুজে
থোকা থোকা লাল রক্ত, আর সেই
সবুজের বক্ষদীর্ণ রক্তের গোলকে
সোনার বাংলার ছবি
মুহূর্তে পতাকা হয়ে দোদুল বাতাসে
(মোহম্মদ মনিরুজ্জামান )
খ. মধ্য-দুপুরে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে, একটা তন্ময় বালক
কাচ, লোহা, টুকরা ইট, বিদীর্ণ কড়ি-কাঠ,
একফালি টিন,
ছেঁড়া চট, জংধরা পেরেক জড়ো করলো এক নিপুণ
ঐন্দ্রজালিকের মতো যতো
এবং অসতর্ক হাতে কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই
প্রায় অন্যমনস্কভাবে তৈরি করলো কয়েকটা অক্ষর
‘স্বা— ধী— ন— তা’।
( শহীদ কাদরী)
গ. ‘১৯৭১ সাল।
আমি পালিয়ে এসেছি আমার দেশ থেকে।
আমার স্ত্রী কোথায়, আমি জানি না। আমার বন্ধুরা
আছে কি নেই, বেতারে সেই উদ্বেগ উচ্চারিত হচ্ছে।
বুদ্ধদেব, আপনার মুখ দর্শনের জন্য আমি এক বিদেশী কূটনীতিকের
ভোজসভায়, অনাহুত বেহায়ার মত ঢুকে গিয়েছিলাম।’
(আল মাহমুদ/বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার)
আল মাহমুদ যেমন মুক্তিসংগ্রামে এদেশের কোটি কোটি মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার চিত্র তুলে ধরেছেন তমনি ভাবে বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা সত্ত্বেও রক্তে-ঘামে তৈরি স্বদেশ এবং প্রত্নস্মৃতির রক্তিম অভিজ্ঞতাপুঞ্জকে কবিরা তাদের চেতনার কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। সংগ্রামের অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞানে রূপান্তরিত হয়ে বিশ্বজনীন সংগ্রাম ও মানবতাবোধে উজ্জীবিত হয়েছেন।
জসীমউদ্দীন ছাড়াও সুফিয়া কামালের ‘আজকের বাংলাদেশ’ও শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’, নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, রফিক আজাদের ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমর্পণ’, হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতা সংকলন ‘যখন উদ্যত সঙ্গীত’, ড. মনিরুজ্জামানের ‘শহীদ স্মরণে’, অসীম সাহার ‘পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মঘাতী রক্তপাত’, আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’, হুমায়ুন কবিরের ‘বাংলার কারবালা’, আসাদ চৌধুরীর ‘রিপোর্ট ১৯৭১’, হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’, মহাদেব সাহার ‘ফারুকের মুখ’ হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, মিনার মনসুরের ‘কী জবাব দেব’, আবিদ আজাদের ‘এখন যে কবিতাটি লিখব আমি’, দাউদ হায়দারের ‘বাংলাদেশ’, আবিদ আনোয়ারের ‘আমার মায়ের নামে তোপধ্বনি চাই’সহ অসংখ্য কবিতায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, যুদ্ধপ্রস্তুতি, যোদ্ধার ভূমিকা, বর্বর পাক হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা, নির্যাতন, অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানসিকতা, পাক বাহিনীর দালালি, মুক্তিবাহিনীকে সমর্থন, মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ সংগ্রাম, মহান বিজয়— এসব ঐতিহাসিক সত্যে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা কবিতা।
প্রচ্ছদ । হিরন্ময় চন্দ