আশরাফ আলীর আর সেই ভাবনাটা নেই। যখন লোহোর দোকানে খাতা দেখার কাজ করত, তখন প্রায়ই মাথা-চাড়া দিত ভাবনাটা। দেবে নাকি দু-চারটে অন্য কথা ঢুকিয়ে! কোম্পানির দু কুইন্টাল আড়াই ইঞ্চি রডের পাশে লিখে দেবে, কাল সকালে অফিসে আসতে একেবারে ভালো লাগেনি? কিংবা লিখে দেবে নাকি আলকাচ মিয়া রোজ দুপুরে যে তরুণী এইচআর ম্যানেজারের সাথে এত ঢলাঢলি কর, তা এই বয়সে মেশিন স্টার্ট নেবে তো! কিন্তু আশরাফ তা করে না। সে জানে, তাহলে আলকাচ মিয়া পান খাওয়া দাঁত দুপাশে লম্বা করে বলবে, রামপেরসাদ নাকি হে? গান লিখে রেখেছ!
না, আশরাফ রামপ্রসাদ নয়। যতই খারাপ লাগুক না কেন, সে শুধু হিসেবটাই লিখবে খাতায়। কিন্তু চাকরিটা তবু রাখতে পারল না আশরাফ। একদিন সে ন’শো আশি টাকার হিসেবের জায়গায় ন’শো চল্লিশ লিখেছিল, মালিক শুধু পিঠ চাপড়ে বলেছিল, দেখেশুনে হিসেব লেখো, তোমার ভুলের জন্য আমি নাহয় এবার চল্লিশ টাকা লোকসান দিলাম, দেখো আর যেন না হয়।
মাথা চুলকেছিল আশরাফ, জবাব দেয়নি। কী করে যে সে ইংরেজি আর বাংলার মধ্যে মিশিয়ে ফেলেছিল! বাংলার আশি লিখতে যে সে ইংরেজির আশি লিখে ফেলল!
বড্ড অন্যমনস্ক তুমি আশরাফ। দশবার ডাকলে তবে সাড়া পাওয়া যায়, আলকাচ মিয়া প্রায়ই বলতেন।
কেন যে অন্যমনস্ক আশরাফ, তা কী করে বলবে! ঠিক যে মুহূর্তে তার সামনে কালো কালো লোহার রড, পায়ের কাছে পড়ে আছে হলঘরের এদিক থেকে ওদিক ধাতব পাত, স্তূপকৃত ইস্পাতের খন্ড, তখন আশরাফ চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে তাদের গ্রামের বটতলা, বাঁশবন, পুকুরের এক কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে তার বউ আশা অন্য মেয়েদের সঙ্গে গল্প করছে। বলছে, এবছর ইদের সময় ঢাকাতে চলে যাবে, আর ফিরে আসবে না।
কিন্তু তবু চাকরিটা চলে গেল। আশরাফ ভেবেছিল এইখানে কাজ করতে করতে সে জীবনে উন্নতি করবে। কত লোক তো আসে আলকাচ মিয়ার কাছে, তাদের কারও সঙ্গে কি সেরকম আলাপ হয়ে যাবে না, যে আশরাফকে একটা ভাল চাকরি দিতে পারে। অথবা তার কাজে খুশি হয়ে আলকাচ মিয়াও তো কোথাও পাঠিয়ে দিতে পারে চিঠি দিয়ে। তাই সে গভীর মনোযোগের সঙ্গে ডুব দিতে চাইত হিসেবে, দেড় ইঞ্চি রড এক কুইন্টালে কতগুলো ধরে, আড়াই ইঞ্চি ক’খানা, সে মুখস্থ করে রাখত, লোহা-লক্কড়ের ভিতর থেকে যতটুকু সম্ভব রস পেতে চেষ্টা করত। তবু ভুল হয়ে গেল। লম্বা একটা হিসেব করতে গিয়ে আলকাচ অ্যান্ড সন্সের এক হাজার টাকা লোকসান করিয়ে দিল আশরাফ। ব্যাপারটা ধরা পড়ল বেশ পরে, যখন টাকাটা আদায় হওয়ার সময় চলে গেছে। আর তো রাখা যায় না। আলকাচ মিয়া কিছু বলার আগেই আশরাফ কলমের খাপ বন্ধ করে নিজের পকেটে পুরল। চটিজোড়া পায়ে গলাল, দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবার আগে পিছন ফিরে বলল, আমি চলে যাচ্ছি। তবু আলকাচ মিয়া ডাকলেন, শেনো হে ছোকরা, অন্য কোথাও কাজ করার আগে যোগ অঙ্কটা ভালো করে শিখে নিও।
এখন আশরাফ জানালা দিয়ে তাকালে চোখে পড়ে কাঁটাবন রোড। বাসের লাইন, উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটা-দুটো সুন্দরী মেয়ে, রাস্তার বাঁদিকে পর পর তিনটে গলি। আশরাফ এখান থেকে দেখতে পায় বই, বইয়ের বান্ডিল, বইয়ের থলি হাতে ময়মনসিং বা নেত্রকোণার লোক, নীলফামারী বা লালমনিরহাটের লোক। আশরাফ মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবে, এই সেই দেশ বিখ্যাত নীলক্ষেত, এই সেই বইপাড়া; কালিকাপুরের আশরাফ আলী এখন এখানে। আশরাফের সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি, পাঁচখানা বইয়ের মলাট পিন দিয়ে আটকানো, ডানদিকে, বাঁদিকে এপাশে-ওপাশে শুধু বই আর বই। যে-টেবিলের উপর হাতে ভর দিয়ে বসে আছে আশরাফ, তারও আধখানা ঢেকে আছে বই, এপাশে একচিলতে জায়গায় গোল করে পাকানো প্রুফ। আশরাফ একটু পরে সেই প্রুফ মেলে ধরবে, পাশে কপি রাখবে, তারপর কপি মিলিয়ে মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস—আদি পর্বের প্রুফ পড়তে থাকবে।
এটা কি উন্নতি? মাঝে মাঝে ভাবে আশরাফ। সবই তো ছিল তার। একটা ছোট মাঠ, মাঠের পাশে তার বাড়ি। অ্যাসবেসটাসের ছাউনির নিচে তার সুখী পৃথিবী, আশার চুড়ির শব্দ প্রদক্ষিণ করত তার দিনরাত। একটা চাকরি ছিল। চাকরি নয়, মাস্টারি। প্রতিদিন ঘন্টার মাপে মাপে ছাত্রদের সামনে কথা বলা। সকালে সাঁতার কেটে গোসল করত, বিকেলে নদীর ধারে ঘুরে বেড়াত। প্রায় দিনই ঈশানের জমিতে ধানের ফলন দেখে খুশি হয়ে উঠত। তবু সেইসব ছেড়ে একদিন সকালে ঢাকায় চলে আসতে হলো তাকে।
আটচল্লিশ আর সাতান্নয় কত? একশো পাঁচ? আর তার সঙ্গে সাতষট্টি যোগ করলে? একশো বাহাত্তর। আশরাফ এখন প্রায়ই মনে মনে অঙ্ক কষে। তবে কি ফাঁকি ছিল কোনও? কাঁধের উপর বইয়ের ব্যাগ খুব ভারী লাগত বলে স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হত। তবু সেই নব ধারাপাত তার সবচেয়ে প্রিয় বই, সে যত্নে ব্যাগে ঢোকাত, বের করত। মাত্র চার বছর বয়সে সে সাতের ঘরের নামতা গড়গড় করে বলে দিতে পারত। তারপর সরল গণিত শিক্ষা কিংবা আর্দশ পাটিগণিত। রামের যতগুলি টাকা ছিল শ্যামের তাহার অর্ধেকের চেয়ে দশ টাকা কম ছিল। শ্যামের কুড়ি টাকা থাকিলে উভয়ের মোট টাকার পরিমাণ কত? এরকম কত অঙ্ক যে সে মুহূর্তের মধ্যে করে ফেলেছে। কিন্তু তবু ভুল হয়ে গেল কেন? লোহার দামের চেয়ে অঙ্কের সহজ হিসাব থেকে একটা এক হিসাব যে সে হারিয়ে ফেলল।
কিন্তু আশরাফ আলীর আর সেই ভাবনাটা নেই। লোহার দোকানে হিসাব লেখার সময় নিজের দু-একটা কথা ডুকিয়ে দেবে ভাবত। এখন আর তা ভাবে না। তাছাড়া লিখে ফেলার মত কী কথাই বা আছে তার ?
তার নাম আশরাফ আলী। বয়স চৌত্রিশ। রঙ উজ্জল শ্যামবর্ণ। এক সময় মাস্টারি করত। ছোট্ট মাঠের ধারে তার বাড়ি। চোরকাঁটায় ভর্তি রাস্তায় লুঙ্গি তুলে তুলে হেঁটে স্কুলে যেত আর ফিরে আসত। বাড়িতে তার স্বাস্থ্যবতী স্ত্রী আশা। কিন্তু একদিন সেইসব ছেড়ে ঢাকায় চলে এসেছে। ঠিক কিসের জন্যে তা সে জানে না, স্কুলের চাকরি অস্থায়ী ছিল শুধু এই কারণে? নাকি গ্রামের শান্ত নিরুদ্বেগ জীবন তার ভাল লাগেনি? তার মনে হয়েছিল অন্য কোথাও তার জন্য যাবতীয় সুখ, সমস্ত ভাললাগা অপেক্ষা করে আছে? পঁচিশ বছর বয়সে কালিকাপুর আদর্শ বিদ্যানিকেতনে অ্যাসিসট্যান্ট টিচারের টেম্পোরারি অ্যাপয়েন্ট লেটার আর আশার হাত ধরে সে যদি তার আগের জীবন শুরু করে থাকে, তাহলে ঢাকার এক অন্ধকার ঘরে নিজের হাতে ভাতের ফ্যান-গালা অভ্যাস করতে করতে লোহার দোকানে তার দ্বিতীয় জীবন।
বত্রিশ বছরটা খুব বেশি বয়স-মাঝে মাঝে সে ভেবেছে। তবুও তো দু বছর বেশ কেটে গেল। প্রতি সপ্তাহে বাড়ি চলে যায়। বড্ড খরচ, তবুও। বাড়ি গেলে শনিবার পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিন মনে হয় । কিছুতেই আসতে ইচ্ছে করে না। মায়ের সাথে কথা বলে আশার ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যাগ হাতে যখন সে রাস্তার দিকে এগোয়, তখন সে মনে প্রাণে কামনা করে আজ বাস বন্ধ থাকুক। সারা বাংলাদেশে বাস ধর্মঘট বলে খবর বেরোক আজকের কাগজে। সেই কাগজ পড়ুক শরৎ বুক হাউসের শরৎ বাবু। সোমবার সে বাড়িতে থাকবে। শুক্র আর শনি সেই সঙ্গে রবিবার। দুদিন এবং তিন রাত্রি। কী যে সাংঘাতিক কষ্টকর আশাকে ছেড়ে থাকা—প্রতি সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে আশরাফ বুঝতে পারে তীব্রভাবে। ঝুল-ধরা কড়িকাঠের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে একলা তক্তপোশ তার কাছে বড়ো শক্ত মনে হয়। ঘুম আসে না, কিছুতেই দু চোখের পাতা বুজতে পারে না।
একটু যদি উন্নতি করতে পারে। বেশি না, হাজার তিনেক টাকাও যদি পেত! তাহলে একখানা ঘর. কিছু জিনিসপত্র, এই স্টোভটায় বড়ো ধোঁয়া ওঠে, একটা ভালো দেখে স্টোভ, আশাকে নিয়ে সংসার পাততে পারত। তাহলে সে আর বৃহস্পতিবারের জন্য এমন ব্যাকুল হয়ে থাকত না। এমন খারাপ লাগত না। কিন্তু তা তো আর হয় না। শরৎ বুক হাউসের শরৎ বাবু লোক ভালো। কিন্তু একজন প্রুফ রিডারের মাইনে দু হাজারের বেশি বাড়িয়ে বাংলাবাজারে রেবর্ড স্থাপন করার ব্যাপরে একটুও আগ্রহী নন।
ফলে একইভাবে দিন যায়। জানালার বাইরে তাকালে লম্বা কাঁটাবন রোড, বাসের লাইন, মানুষজন, রিকশা, হুড়োহুড়ি, আর জানালার এপারে সারি সারি শব্দ, বর্ণমালার সবকটি বর্ণ একসঙ্গে ভিড় করে মাথা তুলে থাকে। আশরাফ একে একে তাদের সনাক্ত করে, তাঁদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে, তাদের অর্থ নিয়ে ভাবে, ভুল শব্দটির গায়ে খুব সাবধানে তার কলমের ডগা চেপে ধরে। বড়ো কঠিন কাজ—আশরাফ সবসময় ভাবে—এভাবে একটির পর একটি শব্দের উপরে চোখ বুলিয়ে যাওয়া। এদের একেসঙ্গে কখনও সে দেখে না। প্রতিটি স্বতন্ত্র শব্দ। প্রতিটির গন্ধ আলাদা, প্রতিটির রঙ অন্যরকম। ফলে তার সামনে কখনও শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের একটা পৃষ্টা সম্পূর্ণ ফুটে ওঠে না, তার বদলে কিছু শব্দ, ছোটবেলায় বাড়ির পিছনের খামারে গর্ত খুঁড়ে মারবেল খেলার মত তার চোখের সামনে ঝনঝন করতে করতে গড়িয়ে যায় মুঠো মুঠো শব্দ। অসহায়ের মত তাকিয়ে আশরাফ। আমি কি এদের চিনতে পারব? কে ভুল আর কে ঠিক, আমি কি জানি?
ইউ লাস্ট বেনচার উঠে দাঁড়াও তো তোমাকে দেখি, তুমি তো ক্লাস এইটের আশরাফ, এখানে, ক্লাস সেভেনের লাস্ট বেনচে বসে আছ চুপচাপ, ওঠো, উঠে দাঁড়াও। মাঝের সারিতে এ কেÑএতো খ, আমি কেমন ঋ বলে ভ্রম করেছি, য এর জায়গায় এ তো ষ, পেটটা কাটা আছে, আমি ঠিক খেয়াল করিনি। আমি একা কি পারি এতোসব? আশরাফ ভাবে, এত অজস্র ঠিক শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বেঠিক শব্দাটাকে টেনে বের করে আনা কি আমার পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া তার বড়ো মায়া হয়। এমন নিষ্পাপ বর্ণের গায়ে ছুঁচোলো কলমের ডগা চেপে ধরলে সে আশঙ্কা করে এই বুঝি রক্তপাত হবে, পাশের এ-কারের কাছে মাঝের এ-কারÑআশরাফের মনে হয়, কোনও পাখির ডানার কোপ মারছে, এতো নিষ্ঠুরতা ভালো নয়। পুকুরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ থমকে থামে আশরাফ। এত সুন্দর পিঠ খুলে এক কোমর পানির উপর দাঁড়িয়ে আছে, ও কে? কালিকাপুরের অ্যাসিসট্যান্ট টিচারের পক্ষে বেমানান কৌতুহল। তবু দাঁড়ায়, মুখ ফেরাতে দেখে এ কী, এতো আশা, আশার পিঠ, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। আশরাফ টেবিলের উপর থেকে মুখ তোলে। সামনে রবীন্দ্রনাথের ছবি, পর পর পাঁচখানা বইয়ের মলাট, শরৎ বাবুর গলা শোনা যায়। খদ্দেরের সঙ্গে কথা বলছে, কোন লাইব্রেরি? না, টোয়েন্টি পারসেন্টের বেশী কিছুতেই দিতে পারব না।
আশরাফ জানে, এর মধ্যে তার নিজের কথার কোনো স্থান নেই। চর্যাপদের পরে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, তার কিছু পরে অনুবাদ সাহিত্য। কৃত্তিবাস কিংবা মালাধার বসু।
ফুলিয়া গ্রামে এক কবির জন্ম, ঠিক কত সালে জানা যায় না। কালিকাপুরের আশরাফ আলী ও কোনো কবির নাম নয়। চন্ডীদাস সমস্যা বাংলা সাহিত্যে এক কঠিন সমস্যা। আশরাফ আলীর সমস্যা অবশ্য তার চেয়ে কিছু বেশি। সে তিন হাজার টাকা মাইনে চায়, একটা ভালো স্টোভ চায়, আর আশাকে নিয়ে এই শহরে থাকতে চায়। কিন্তু তার এই চাওয়াকে সরিয়ে রাখে এই শহর, বাংলাবাজারের নির্ধারিত রেট, তার সামনে কেবল সত্য হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের আদিপর্বের থার্ড ফর্মার প্রিন্ট অর্ডার।
দিন যায়। আশরাফের নাগরিক জীবন জুড়ে এক অদ্ভুত শব্দ সভ্যতা গড়ে ওঠে। ঘুম ভাঙলে আশরাফের মনে পড়ে যায় তৎসম আর তদ্ভব শব্দের ফারাক, স্নান করতে করতে ভেবে নেয় ণত্ব বিধি ষত্ব বিধির নিয়মগুলো, আলুসেদ্ধ ভাত খাওয়ার সময় সে প্রায় দশটা কঠিন বানান নিজেকে জিজ্ঞেস করে। আশরাফের ড্রয়ারে বাঁধানো চলন্তিকা, যে কোন সময় একবার করে খুলে দেখে নেয়। বিকেলে পঞ্চাশ গ্রাম মুড়ি বাদাম নিয়ে খাওয়ার সময় বাঁ হতে অভিধানের পাতা উল্টে যায়। কখনও সে ক বর্ণের পৃষ্টা খুললেই তার চোখের সামনে ফুটে ওঠে কালিকাপুর, গ্রাম, তার মাটির রাস্তা, দুধারে বাঁশগাছ, গাছের উপরে পাতায় পাতায় শিরশির শব্দ। বাসের রাস্তা থেকে গ্রামে পৌঁছানোর প্রায় দু-মাইল মেঠো রাস্তা, বৃহস্পতিবার সন্ধায় একজনকে প্রায় দৌড়ে পেরিয়ে যেতে আশরাফ। আ-বর্ণের পাতা খুললেই সমস্ত শব্দজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকে আশা, ঠোঁট চেপে তার হাসি, লজ্জাবনত মাথায় ঘোমটা। বড্ড কম বয়স আশার। তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায় এক যুগের ব্যবধান। ঢাকায় কেউ যদি শোনে হাসবে বোধহয়। মনে আছে বিয়ের সেই দিনগুলির কথা। বাপের বাড়ি থেকে আসার সময় হলে গোটা দুদিন দুরাত ধরে কাঁদত আশা। এখনও মনে পড়লে বেশ হাসি পায় আশরাফের।
থার্ড ফর্মা পর ফোর্থ ফর্মা, ফাস্ট প্রুফের পর সেকেন্ড প্রুফ। সেকেন্ড রিডিংয়ের পর আশরাফ পাঞ্জাবির পকেটে গোল করে প্রুফ ঢুকিয়ে নিয়ে এক অধ্যাপকের বাড়িতে যায়। কল্যাণপুর বাস ডিপের কাছে অধ্যাপকের বাড়ি। দরজায় কলিংবেল বাজালে ছোট একটি কাজের ছেলে দরজা খুলে দেয়, আশরাফ কোনও দিন নিজের নাম বলে না, বলে শরৎ বুক হাউস থেকে লোক এসেছে, বলো। বেশির ভাগ দিনই গেট থেকে ঘুরে আসে আশরাফ। এক এক দিন শুধু তাকে ভেতরে যেতে দেওয়া হয়, চটি খুলে খুব সংকোচের সঙ্গে সোফার উপরে বসে সে। তার জন্য সেদিন এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয় অধ্যাপক। তারপর সামনে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে সুন্দর চেহারার অধ্যাপক মন দিয়ে কী যেন ভাবেন, আর অকস্মাৎ ভারী ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে দুই তীক্ষè চোখ আশরাফের উপর রেখে আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, আপনার কেমন লাগছে, পড়তে? এই প্রশ্নে আশরাফ যেন ধন্য হয়ে যায়। কালিকাপুর স্কুলের অ্যাসিসট্যান্ট টিচারের বিজ্ঞতা তার মুখে এসে জমা হয়। একটু সমালোচনা করার লোভ কিছুতেই সে জয় করতে পারে না। বলে, অন্য বিষয় নিয়ে আমার কিচ্ছু বলার নেই, শুধু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের চ্যাপ্টারটা আরেক একটু প্রাঞ্জল করতে পারতেন। আসলে এই কাব্যটা তো সাধারণ গ্রাম্য ছেলের গল্প। আপনি শ্রীকৃষ্ণকে খুব ঈশ্বর করে দিয়েছেন। ফলে বড়ো বেশি দার্শনিক কচকচানি হয়ে গেছে। বলে ফেলেই আশরাফের মনে হয়, কথাটা বলা তার উচিত হয়নি। সে একটু মাথা নিচু করে, অধ্যাপকের আর একবার তার দিকে সরাসরি তাকান, তাঁর ফর্সা গালের উপর সামান্য কুঞ্চন পড়ে, আশরাফ বুঝতে পারে না উনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন কিনা, সে খুব লজ্জিত বোধ করে। অধ্যাপক হঠাৎ উঠে দাঁড়ান, ঠিক আছে, আমি দেখে রাখব, কাল এসে আপনি নিয়ে যাবেন। আশরাফের চা তখনও খাওয়া হয়নি, খুব তাড়াতাড়ি গরম চা এক চুমুকে খেয়ে ফেলে, জিভ পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তবু সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে দাঁড়ায়, বলে আচ্ছা আমি কাল আসব। এ রকম সময় তো? শেষ প্রশ্নের জবাব দেন না অধ্যাপক। দোতালার সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে যান। আশরাফ বাড়ির বাইরে চলে আসে।
এক রবিবার আশরাফ এসে পৌঁছুতেই শরৎ বাবু বললেন, আপনি এক্ষুনি একবার অধ্যাপক সাহেবের বাড়ি যান। বিশেষ দরকার। বেরোতে যাবে, শরৎ বাবু বললেন, আর হ্যাঁ, ফিফথ আর সেভেনথ ফর্মার প্রিন্ট অর্ডারের প্রুফ দুটো প্রেস থেকে চেয়ে নিয়ে যাবেন। আশরাফ অবাক হয়। কিন্তু সে তো ছাপা হয়ে গেছে।
জানি। শরৎ বাবুর গলা একটু গম্ভীর শোনায়। যে প্রুফে আপনি প্রিন্ট অর্ডার দিয়েছিলেন সেগুলো উনি দেখতে চেয়েছেন।
আশরাফের বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে। আবার কি ভুল হল কিছু? সে শরৎ বাবুর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল কওে চেয়ে থাকে। শরৎ বাবু কিছুই বলেন না আর। তিনি ক্যাশবাক্স খুলে টাকা মেলাতে থাকেন, আশরাফ সিঁড়ি ভেঙে আস্তে আস্তে নামতে থাকেন।
বাসে উঠে আশরাফ প্রুফ দুটো তন্নতন্ন করে মেলাতে থাকে। এ প্রুফ তো লেখক নিজেও দেখেছেন। তারও কি চোখে পড়েনি? আশরাফ অস্থির হয়। তাদের গ্রামের উত্তর পাড়ায় একবার চুরি হয়েছিল। রাত্রে নয়, দিনের বেলা পুকুরঘাট থেকে ভিজিয়ে রাখা বাসন তুলে নিয়ে গিয়েছিল কেউ। নিশ্চই পাড়ার লোক। খুব গালমন্দ করার পর বাসনের মালিক বলল নলচালা করা হবে। সন্ধেবেলা পাড়ার লোকেরা জমায়েত হলো এক জায়গায়। দূর গ্রাম থেকে ওঝা এল, সঙ্গে বাঁশের নল। দুজন লোকের হাতে নল তুলে দেওয়া হল। এবার নল চোরের গলা চেপে ধরবে। এত লোকের মধ্যে আসল অপরাধীকে শনাক্ত করবে নল। আশরাফের দু চোখ তন্নতন্ন করে খুঁজে গেল, কোথায় আছে সেই কালপ্রিট, এত শব্দের মধ্যে সেই অপরাধী লুকিয়ে আছে কোথায়—?
বাস থেকে নেমে বাকি রাস্তা পা আর চলে না আশরাফের। কী বলবেন অধ্যাপক? তাকে অশিক্ষিত বলবেন? সে বানান জানে না? নাকি সে অন্যমনস্ক বড্ড? মন দিয়ে প্রুফ পড়তে পারে না? খুব দ্বিধার সঙ্গে কলিংবেলে হাত রাখে সে। একটু পরে আশরাফ চটির শব্দ পায়। অধ্যাপক নেমে আসেন সিঁড়ি দিয়ে। আশরাফ উঠে দাঁড়ায়। অধ্যাপক তার সামনে এসে, দেখি বলে প্রুফটা চেয়ে নেন। আশরাফ দেখে তাঁর হাতে দুটো ফর্মার ফাইল কপি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তিনি ফরফর করে প্রুফগুলো খুলে ফেললেন। এপাতা থেকে ওপাতা চোখ বুলিয়ে যান। আশরাফ চুপচাপ কার্পেটের রঙ দেখে, বুক সেলফে বই, দেয়ালে ছৌ নাচের মুখোশ, বাল্বের উপর অদ্ভুত কারুকার্যময় ঢাকনা। গোটা সময়কে তার অনন্তকাল বলে মনে হয়। একটু পরে অধ্যাপক বসেন। তাকে বসতে বলেন। ভারী ফ্রেমের ভেতর ভয়ঙ্কর দুটি চোখ আশরাফকে বিদ্ধ করে। অধ্যাপক বলেন, আপনি দন্ত্য-স লিখতে জানেন না, আপনার সব দন্ত্য-স কে প্রেস ‘ম’ করে দিয়েছে।
আশরাফ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। সে চোখের সামনে দেখে একজোড়া গোঁফ, পান-খাওয়া দাঁত, একটু উঁচু বালিশে হেলান দিয়ে বসে থাকা একজন লোক। চারদিকে লোহার স্তূপ। আশরাফের কানে বাজে—কোথাও কাজ করার আগে যোগ অঙ্কটা ভালো করে শিখে নিও।
আশরাফ অপেক্ষা করে। এক মিনিট, দু মিনিট, তিন মিটি। অধ্যাপক নিজের মনে বলেন, এই ফর্মা দুটো আবার ছাপতে হবে। তারপর আবার চুপচাপ। অনেকক্ষণ পরে অধ্যাপকের গলা শোনা যায়। আসুন আপনাকে দন্ত্য-স লেখা শিখিয়ে দেই। আশরাফ দেখে, অধ্যাপক তার কাছে এসে বসেছেন। সামনের সেন্টার টেবিল থেকে তুলে নিয়েছেন একটা প্যাড। হাতে তাঁর একটা কলম। কাগজের উপর কলমের আঁচড় দিচ্ছেন।
খুব দ্রুত আশরাফের সামনে দৃশ্যপট বদল হয়ে যায়। আজ আশরাফের হাতেখড়ি। সকাল থেকে ব্যস্ততা বাড়িতে। আব্বার পীরবাবা আসবেন, মিলাদ হবে। উঠোনের অনেকটা জায়গা পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে। দুদিকে দুটো পিঁড়ি পেতে রাখা। মিলাদের পর পাশের গ্রাম থেকে আসবে নান্টু মাস্টার। এই এলাকার একমাত্র পন্ডিত। বেলা দ্বিপ্রহরের সময় মিলাদ শেষ হল। গোসল করে আতর সুরমা লাগিয়ে নতুন পাজামা পাঞ্জাবি প’রে পাঁচ বছরে পা-দেওয়া আশরাফ এসে বসল একটি পিঁড়িতে। চারদিকে পাড়ার লোকরা ঘিরে ধরেছে। অন্য পিঁড়িতে নান্টু মাস্টার। তাঁর গায়ে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি। আশরাফকে তিনি দোয়া করলেন প্রথমে। তারপর একটা পেতলের রেকাব থেকে তুলে নিলেন মোটা চকখড়ি। ঝকঝকে মেঝের উপর দাগ কাটলেন। সূরা উচ্চারণ করলেন। আশরাফের হাতে চকখড়িটা দিলেন। তারপর নিজে আশরাফের হাতটা ধরে মেঝেতে লিখলেন আর মুখে বললেন, বাবা, বলো—অ। আশরাফ বলল অ। বলো আ। আশরাফ বলল আ।
বুঝতে পেরেছেন?
আশরাফ ঘাড় নাড়ে। হ্যাঁ পেরেছি। যান, বাড়িতে প্র্যাকটিস করুন কয়েকদিন। আশরাফ উঠে দাঁড়ায়, চটি গলায় পায়ে। দরজা খুলে বাইরে আসে। অন্য দিনের মত পরিচিত রাস্তা, রাস্তায় লোকজন। বড় রাস্তার মুখে একটা ষাঁড় দাঁড়িয়ে, একটু পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে পথচারী। আশরাফ এগোয়। রাস্তার পাশে একটা সাইনবোর্ড, তাতে লেখা, সামনে স্কুল—আস্তে চালান। তাতে আঁকা, ব্যাগ কাঁধে একটি ছেলের ছবি। আশরাফ পেরিয়ে যায়। বাজার বসেছে ফুটপাতে। ভ্যানের শার্ট দর করছে একজন লোক। পঞ্চাশ টাকা? এখনও পঞ্চাশ টাকা? একটা ঠেলার পিছনে আটকে আছে বাস, হর্ন বাজছে জোরে। বাসের গায়ে লেখা সায়দাবাদ-যাত্রাবাড়ি। সায়দাবাদের দন্ত্য-স এ বারবার চোখ আটকে যায়।
গোসল হয়নি আজ। রুক্ষ চুলের ভিতরে আপনা-আপনি চলে যায় আঙুল। কাল রাত্রে আশাকে বলেছিল, আর কিছুদিন, মাত্র আর কিছুদিন অপেক্ষা করো, আমি একটা বাসা ঠিক জোগাড় করে ফেলব। তার বুকের কাছে মুখ এনে আশা বলেছিল, তোমাকে ছেড়ে একদিনও থাকতে ইচ্ছে করে না।
প্রথম বাসটায় ওঠে না আশরাফ, ভর্তি হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বাসটায় উঠে জানালার ধারে বসে। ইলেকট্রিক পোস্টের উপরে একটা কাক বসা। অজস্র শব্দ হচ্ছে চারিদিকে। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে বাসে উঠল একদল মেয়ে-পুরুষ। আশরাফ অন্যমনস্কভাবে অভিশপ্ত ফর্মা দুটো দেখে। ম কেটে দন্ত্য-স করেছেন অধ্যাপক। তার চোখে পড়ে বেশ কিছুটা অংশ অ্যাডও করেছেন। দুটো লাইন পড়ে ফেলে আশরাফ—শ্রীকৃষ্ণ নামে এক বালক ছিল। গোপপাড়ায় দুর্দান্ত বলিয়া তাহার বদনাম ছিল প্রচুর। একটা দীর্ঘশ্বাষ পড়ে আশরাফের। সে পাতাটা বন্ধ করে দেয়।
বাসটা চলতে শুরু করলে আশরাফ নিজেকে প্রশ্ন করল, কত বয়স হল আশরাফ? হিসেব করে উত্তর দিল নিজেই—পঁয়ত্রিশ। সংসদ ভবন রোডের পাশ দিয়ে যাচ্ছে বাস, জোরে হর্ন বেজে উঠল। দুদিক দিয়ে দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে মোটরগাড়ি। ফার্মগেট মোড়ে গিজগিজ করছে মানুষ। এরা সবাই ঢাকার লোক? এদের প্রত্যেকের একটা ঠিকানা আছে। যারা নারায়ণগঞ্জ কিংবা মাকিগঞ্জ, গাজীপুর কিংবা টাঙ্গাইল থেকে আসে তারা সবাই ফিরে যায়, কিন্তু নীলফামারী কিংবা লালমনিরহাট, বরিশাল কিংবা সিলেটের কিংবা যারা ঢাকার যারা তারা থাকে।
ফার্মগেট পার হতেই বাসের গতি খুব বেড়ে যায়। কালিকাপুরের আকাশে সূর্য কি ঢলে পড়েছে এখনই? হাইস্কুলে কি ছুটির ঘন্টা বাজল? কী করছে এখন আশা? আশরাফকে কেউ যদি এখন নিজের কথাটা লিখতে বলে, কী লিখবে সে? এই মুহূর্তে তার বলার কথা কী?
আটচল্লিশ আর সাতান্নয় কি সত্যিসত্যি একশো পাঁচ হয়? লোহার দোকানে তিন অঙ্কের হিসেব থেকে কী করে পড়ে যায় একটা এক? শরৎ বুক হাউসের সিঁড়ি এত খাড়া, এমন আকাশ-প্রমাণ উঁচু হয়ে গেল কী করে?
ম-এর নিচে একটা পাগড়ি থাকে, দন্ত্য-স এ থাকে না। ম-এর আঁকড়ি শুরু হয় ডানদিকে কিন্তু দন্ত্য-স এর বাঁদিক থেকে।
বাস যখন নীলক্ষেত মোড়ে ঢুকেছে, আশরাফ আর একবার জিজ্ঞেস করে নিজেকে।
—বয়স কত হল আশরাফ?
—পঁয়ত্রিশ।
এই বয়সে কি আর একবার নতুন করে শুরু করা যায়?
কী উত্তর দেবে তা-ই ভাবতে থাকে আশরাফ…।