যাত্রা । আব্দুল্লাহ্ আল বাকী

0
Showing 1 of 1

ইউনূস আলী মোল্লা হঠাৎ পাটের ব্যবসায় নিজের নাম জৌলুসের সাথে উপার্জন করেছেন কিছু নগদ টাকা। তাই যুদ্ধের খবর শুনে তিনি চিন্তিত, সেই কারণেই গ্রাম ছেড়ে পালানোর একটা উপায় খুঁজতে থাকলেন। রেডিও মারফত খবর পাওয়া গেছে ২৫ তারিখ রাতে ঢাকায় নাকি দলে দলে মানুষ মারা হয়েছে। সেই রাত থেকেই শেখ সাহেবের কোনও খোঁজ নাই। কেউ বলছে শেখ সাহেব কে হত্যা করা হয়েছে সে রাতেই, আবার কারও কারও মতো শেখ সাহেব ঠিক ঘাপটি মেরে আছে, সময় মতো ঠিকই বের হয়ে আসবেন। ঢাকা শহরের অলি-গলি তো আর কম না, তারা ভিনদেশী মানুষ তারে ক্যামনে খুঁজে বের করবে, সাধ্যি আছে কারো। তার মতো লোক কে ধরা এতও সহজ না। আবার কেউ কেউ এও বলছে শেখ সাব গণ্ডগোল শুরু হবার আগেই ইন্ডিয়া চলে গেছে। এই তিনটা মতই আপাতত বাজারে বেশি মুখরোচক হয়েছে, তবে সত্যি কথা যে আসলে কোনটা তা কেউই জানে না। সবই সময়ের অনুমান মাত্র।

তবে ঢাকার রাস্তায় মানুষ যে মারা পড়েছে এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। পাশের গ্রাম সাতবাড়িয়ার বাহাদুর মিয়া ঢাকায় রিকশা চালায়। নবাবপুরে একটা গ্যারেজে সে রাতে ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎই গোলা-গুলির আওয়াজে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। তারপর প্রাণপণ দৌড়েছে সবাই, কে কোনদিকে গেছে কেউ বলতে পারবে না। শেষে এ-পথ সে-পথ ঘুরে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে নদীর ওপারে দিন কয়েক গ্যারেজের পরিচিত এক রিকশাওয়ালার বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে থেকে নানান পথ ঘুরে শেষে গ্রামে পৌছেছে। তারপর থেকেই বাজারের চায়ের দোকান পুরোটা নিজের গল্পে মশগুল করে রেখেছে। মানুষ পার্বনের পালা শোনার মতো ভিড় করে তার গল্প শোনে। সবাই যে তার কথা বিশ্বাস করে বিষয়টা তেমনও না। কেউ কেউ সেই ভিড় থেকে বলে ওঠে—

আরে ধুর এতো লোকেক কি তাই এক রাতে মারতে পারে নাকি? যতটুক ঘটছে তার সাথে রংচং মাখায়ে সব আষাঢ়ের গল্প ফাঁদছে।

আবার অনেকের মতো ভিন্ন, তাদের যুক্তি হলো—

বাহাদুরের সব কথা সত্যি না হলেও কিছুটা তো সত্য।

আবার এমনও মানুষ আছে যারা বাহাদুরের সব কথাই একদম অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। তাদের যুক্তি একদম সহজ—

তুমি তো বাপু আর গিয়ে দেখো নাই। সে যখন দেখছে তাইলে তার কথাই সত্য।

তবে ঢাকা না হলেও রাজশাহী শহর থেকে একজন ফিরেছে, ওপাড়ার নাসির মিয়ার ছেলে নিজাম। তার মতি-গতি আবার একদম ভিন্ন। সেই এসে থেকে যে একবার ঘরে ঢুকেছে তার আর বের হবার কোনও নাম নেই। তার চারদিকে ঘোর লেগে আছে। কারও সঙ্গে তেমন কোনও কথাও বলে না। তার মতিগতি কেউ কিছু আঁচ করতে পারে না। শহরের কলেজে দর্শনে পড়াশোনা করে। হঠাৎ এই মতিভ্রমের কারণটা বেশির ভাগই প্রেম বলে চালিয়ে দেয়। কিন্তু পুত্রের এমন নিশ্চুপতা মাকে ভাবায় খুব। তার এই মৌনতার কারণ প্রথম প্রকাশ পায় তার স্কুলশিক্ষক আলিম স্যারের কাছে। সেদিন আলিম স্যারকে নিজাম বলেছিল—

স্যার শহরে ওরা নির্বিচারে মানুষ মারছে। পুলিশ লাইনের যুদ্ধে পুলিশের সাথে ছাত্র-জনতা মিলে প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছি আমরা, কিন্তু ওদের ভারী অস্ত্রের কাছে আমরা কিছুতেই টিকতে পারিনি। দু’দিন যুদ্ধ চালাবার পর আমরা শেষে পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসেছি।

তা এখন কি করতে চাস? কিছু কি ভেবে রেখেছিস?

কি করবো জানি না স্যার। তবে ঘরের ভেতর বসে থেকে মরার কোনও মানে হয় না। ভাবছি সময় সুযোগ পেলে ওপারে গিয়ে ট্রেনিং আর অস্ত্র নিয়ে আবার দেশে ফিরবো।

কথাটা কীভাবে যেন এ-কান সে-কান হতে হতে পুর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। বিষয়টা নিয়ে বেশ চিন্তিত নিজামের মা। তার দশটা না পাঁচটা একটা মাত্র সন্তান কোলহারা হয়ে গেলে তিনি কাকে নিয়ে বাঁচবেন। তাই পুত্রের কাছে মা আবদার নিয়ে যায়—

বাপরে শুনলাম কাশেম ফকির নাকি রাজাকার বাহিনী তৈয়ার করছে। আমি কই কি তুই যহন যুদ্ধেই যাবি তাইলে ওই জায়গাতই যা। মুক্তিবাহিনী হইলে নাকি খালি পালায়ে বেড়ান লাগে।

কথাটা শুনেই আগুনের মতো জ্বলে ওঠে নিজাম। তারপর রাগত স্বরে বলতে থাকে—

মা তুই যদি আর একবার এই কথা কইস তাইলে কিন্তু আমি আর তোর কাছে ফিরে আসমু না। রাজাকার হইলো দেশের শত্রু, তার সাথে আমি যামু ক্যান? দেশ হইলো মা। এহন ক্ আমি কি তোর সাথে বেইমানি করতে পারি?

মা চুপ হয়ে যায় আর কোনও কথা বলে না।

এদিকে পুরো গ্রাম ছড়িয়ে যায় ইউনূস আলী মোল্লার গ্রাম ছাড়বার খবর। তবে কবে যে ঠিক পাড়ি দিবে তা কেউ জানে না। শুধু আড়ালে থেকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে থাকে একজন। বিষয়টা ইউনূস আলী মোল্লাও খুব ভালো ভাবেই আঁচ করতে পারেন। তাই আরও সতর্ক হয়ে যান। কারণ তার মাঠের জমি, বাড়ি-ঘর, গরু-ছাগল সব থুয়ে গেলেও সাথে নিয়ে যাবেন নগদ টাকা তবে তার চেয়েও বড় ভয় সাথে থাকা স্ত্রী আর যুবতী কন্যাদ্বয়। ইউনূস আলী মোল্লা তাই আর কারো কাছেই নিজের বিশ্বাস পান না। সঙ্গোপনে কয়েক গ্রাম দূর থেকে নৌকা ভাড়া করা হলো। ঠিক আঁধার ভোরে যেই নৌকা ভাসানোর জন্য পাড়ে থেকে খুটাটা তোলা হচ্ছে, এমন সময় সবাই দেখতে পেল দূর থেকে হাত তুলে দৌড়ে নৌকার দিকে ছুটে আসছে কেউ একজন। প্রথমে অপরিচিত লাগলেও একটু কাছে আসতেই বোঝা গেল নিজাম আসছে। ইউনূস আলী মোল্লা দ্বিধায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিজামকে নৌকায় তুলে নিলেন। ভাবলেন ভবিষ্যতের কথা তো আর বলা যায় না, যদি কোনও বিপদ আসে তা সামলে নিতেও তো কাউকে না কাউকে দরকার হয়। পরে নিজামকে জিজ্ঞেস করলেন—

কিরে তুই কি আগে থেকেই জানতি আজকে আমরা চলে যাবো?

না চাচা, প্রতিদিন ভোরে একবার করে ঘাটে আইসে দেইহে যাই কোনও নৌকা ভীরিছে কিনা। তয় আজকে আসতে একটু দেরিই হইছে। ভাগ্যের জোরে খেয়া পাইয়ে গেছি।

তারপর আর কেউ কোনও কথা বলে না। কেবল নৌকা চলতে থাকে চৈত্রের খরায় শুকিয়ে যাওয়া শীর্ণ নদীতীর ধরে। আকাশে তখনো সূর্য ওঠেনি, কেবল চারপাশটায় আলো আসতে শুরু করেছে। নৌকার দুলুনিতে গত হওয়া নির্ঘুম রাতের ঘুম পুষিয়ে নিতেই নৌকার পাটাতনেই শরীর এলিয়ে ঘুমাতে শুরু করলো নিজাম। আর পাটাতনের নিচে ইউনুস আলী মোল্লার স্ত্রী আর কন্যারা ভয়ার্ত হরিণের মতো ঘাপটি মেরে আছে। ইউনূস আলী মোল্লা নৌকার পাটাতনে বসে তার সম্পদ আগলে রাখার চিন্তায় মগ্ন। এভাবে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই ইউনূস আলী মোল্লা দেখতে পেলেন নদীর অপর পাশের একটা ঝোপ থেকে দুটো মেয়ে বের হয়ে হাত নাড়িয়ে নৌকা ভেড়াতে আহ্বান জানাচ্ছে। হঠাৎ তাদের দেখতে পেয়ে ইউনূস আলী মোল্লার মনের ভেতর একটা মায়ার ভাব জেগে ওঠে। ভাবছে তার মেয়ের মতোই মেয়েগুলো হয়তো কোনও বিপদে পড়েছে। আর এই আসন্ন বিপদ থেকে তাদের উদ্ধার করা নৈতিক দায়িত্ব। তাই মাঝিকে তাগাদা দেয়া হলো অপর প্রান্তে নৌকা ভেড়ানোর। আরও একটু কাছে যেতেই দেখা গেল ঝোপ থেকে ধুলোমাখা সাদা ধূতি ও একটা আপাত ময়লা পাঞ্জাবি পড়া পৌঢ়ত্বের ছাপলাগা একটা লোক বের হয়ে আসতে দেখেই তার মনের ভেতর যেন ভয়ের উদ্রেক হয়। ভাবছেন হঠাৎ আবার কোনও ডাকাতের কবলে পড়লেন না তো। দেখা গেল মেয়েগুলোকে দিয়ে কাছে ডাকিয়ে তার সর্বস্ব লুট করে নেয়া হলো। আবার ভাবছেন যুদ্ধের বাজারে ঠিক সবাই বিপদেই আছে, আর তারা সত্যিই বিপদে পড়েছে। এমন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ঘাটে নৌকা ভেড়ানো হলো। কাছে আসতেই চিনতে পারলেন লোকটাকে, মনোহর অপেরার অধিকারী, গনেশ। সবাই তাকে গনেশ অধিকারী নামেই চেনে। মনের মাঝে জন্মনেয়া আসন্ন বিপদের শঙ্কা কাটিয়ে এবারে শুরু হলো নতুন সংকট। গনেশ অধিকারী একে তো হিন্দু তার উপর দশ গ্রামের চেনা মুখ আবার পড়ে আছে ধূতি আর পাঞ্জাবি। ঠিক তখনই মনে পড়ে যায় সাতবাড়িয়ার বাহাদুরের কথা। বাহাদুর বলেছিল, পথে কোনও হিন্দু মানুষ পাইলে তার আর রক্ষা নাই। পোশাকে টের না পাইলে কখনো কখনো লুঙ্গীর গিট্টু খুইলা হইলেও সুন্নতী চিহ্ন দেখায়ে পার পাওয়া লাগে। আর সুন্দরী মেয়ে দেখলে তাদের গাড়িতে তুলে কই যে নিয়ে যায় তা আল্লা মালুম। নৌকা ঘাটে ভিড়ে যাবার পর এসব কথা মনে পড়তেই বিপত্তিটা বাধলো। এখন সামলে নেবেন কীভাবে। ইউনূস আলী মোল্লা গনেশ অধিকারীকে উদ্দেশে বললেন—

তুমি অপেরার গনেশ অধিকারী না?

লোকটা কান্না জড়ানো কণ্ঠে কুর্নিশ করার ভঙ্গিমায় করজোড়ে দু-হাত উঁচু করে বললেন—

আজ্ঞে হুজুর, আমাদের দয়া করেন। বড় বিপদে পড়েছি আমরা।

ইউনূস আলী মোল্লা কেমন যেন দ্বিধান্বিত চেহারায় তাকিয়ে থাকলেন। নৌকার পাটাতনের নিচে স্ত্রী ও কন্যাদ্বয়, পাটাতনের উপরে নিজাম গভীর ঘুমে মগ্ন। মাঝিরা তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পলকহীন গনেশ অধিকারীর চোখ। ঠিক অগোছালোভাবে তিনি কিছু একটা বলতে যাবেন। ঠিক এমন সময় গনেশ অধিকারী তার কণ্ঠের আঢ়ষ্ঠতা খুলে বলতে শুরু করলেন—

সেই বৈলামতলার চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় আগে থেকেই বায়না করা ছিল। শহরে গণ্ডগোলের কথা শুনে মেলা হয় কি না হয় তা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। শেষ কালে শুনলাম মেলা হবে। তাই এই গত পরশুদিন দলবল নিয়ে মেলায় হাজির হলাম। কিন্তু চলে আসার পর শুনি মেলা হবে না। শেষে উপায়ন্ত না পেয়ে ফিরতি যাত্রা শুরু করি। ফিরতি পতে পড়লাম রাজাকারের হাতে। এসেই মেয়ে দুইটারে নিয়ে টানাটানি শুরু করলো। টেনে-হিঁচড়ে ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করলো। শেষে খাঁমচে কামড়ে কোনওরকমে রক্ষা পাইছে। সেইখানে থেকে দলের লোক যে যার মতো পলাইছে। এই জান আর পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই সাথে নিতি পারি নাই। আমি এহন পড়ছি বড় বিপদে। এই মেয়ে গুলারে তো আর জমের মুহে ফেলাই দিতে পারি না। সেই রাজাকারের হাত থেকে ছুটে কেরাণিরঘাট, সেহানে থে নৌকায় এই পর্যন্ত আইছি। এহন আপনারা সঙ্গে নিলে ওপার যাইতে পারি।

কথাগুলো শুনে ইউনূস আলী মোল্লার মন হয়তো কিছুটা গলে ছিল। তবে বাহাদুরের কথাগুলো তখনও মাথায় বারবার ঘুরছিল। আর আসন্ন বিপদের কথা মগজে বারবার আঘাত করছিল। হিন্দু হলেই বিপদ। বাইরে সন্দেহ হলে খৎনার চিহ্ন পর্যন্ত দেখানো লাগে। মগজে হয়তো এসব কথার আঘাতের কারণেই দাঁতের সাথে দাঁত ঘষে নিজের চোয়ালটা শক্ত করে তুলে বললেন—

শোন মিয়া, যুদ্ধের বাজার এহন বহুত খারাপ। একে তো তুমি মিয়া হিন্দু মানুষ আবার পড়ে আছো ধূতি আর পাঞ্জাবি। তার সাথে এমন যুবতী মেয়েছেলে নিয়ে রাস্তা পার হওয়া বহুত ঝামেলার। তাই বাপু তুমি অন্য পথ ধরো। এই নৌকায় আর না যাও।

শেষ কথাগুলো বলতে বলতে পরনের লুঙ্গীটা কিছুটা উচিয়ে নিজেই নৌকা থেকে এক আঁজলা জলে নেমে নদীর পাড় হতে নৌকাটা ভাসিয়ে দিতে লাগলো। এমন সময় গনেশ অধিকারীও জলের মধ্যেই তার দু’পা জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিল।

হুজুর আর কার কাছে যাই এহন? এইহানে রাইখা গেলে সবটি রাজাকারের হাতে মারা পরমু। তারচেয়ে ভালো আপনেই আমাগো মাইরা থুয়ে যান।

এমন কান্নার শব্দে নৌকার পাটাতনের নিচে থাকা ইউনূস আলী মোল্লার স্ত্রী দুই কন্যা সমেত বের হয়ে আসেন। হঠাৎ এমন কান্নার শব্দে হকচকিয়ে উঠে নিজামও বিষয়টা ঠিক আঁচ করতে পারছে না। আসলে বিষয়টা কি হয়েছে জানার জন্য সবাই ইউনূস আলী মোল্লার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠৎই মাঝি বলে উঠলো—

নিয়ে নেন কাকা, মানুষ গুলা বিপদে পড়ছে।

তুই চুপ থাক হারামজাদা। বেশি কথা কস না…

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মনোহর অপেরার নায়িকা নন্দিনী আজ অধিকারীর এমন অসহায় অবস্থা দেখে আতকে ওঠে। যে অসহায়াত্বের পিছে আছে এক গভীর দায়িত্ববোধ আর আছে মমতা জড়ানো। নন্দিনী ভাবে—

সেই মনোহর অপেরা তৈরির সময় থেকে সে দলে আছে। অন্যদলের মাঝে যেমন পাপাচার দলাদলি চলে নারীদের নিয়ে। কিন্তু এ-দল তো সে ব্যাপারে বরাবরই আলাদা। কখনোই তেমন কোনও কেলেঙ্কারি এ-দলে হয়নি। একবার এক পাড় মাতাল রাতের বেলা তার ঘরে ঢুকেছিল, মেলা কমিটির লোক ছিল, তবুও ছাড় পায়নি। বায়নার টাকা পর্যন্ত মুখে ছুড়ে দিয়ে এসেছিল। সেই থেকে গনেশ অধিকারীর প্রতি তার সম্মান আলাদাই। হঠাৎই নন্দিনীর মনে পড়ে যায় দলের গোড়ার কথা। মনোহরা ছিল গনেশ অধিকারীর স্ত্রীর নাম, আজীবন আমুদে এই লোকটা কখনোই সংসারমুখী ছিলেন না। সেই যাত্রা গান নিয়ে মেতে থাকা লোকটার স্ত্রী হয়তো না পেরেই তাকে ছেড়ে অন্য কারো সাথে অজানায় পাড়ি দিয়েছিল। কোনওদিন তার মুখে স্ত্রীকে নিয়ে কোনও অভিযোগ শোনেনি কেউ। স্ত্রী চলে যাবার পর ভেতর ভেতর ভেঙে পড়েন তিনি। এরপরই পুরাতন দল ‘দি নিউ গোল্ডেন অপেরা’ ভেঙে যায়। তখন একটা বিরাট সময় বেকার ছিলেন, খেয়ে না খেয়েও দিন পার করেছেন, তবু কারো কাছে মাথানত করেন নি। সবাই মিলে তাকে ধরে আবার নতুন দল গড়লেন, নাম দিলেন ‘মনোহর অপেরা’। সংসার বিমুখী এই মানুষটা কি সমাদরেই না স্ত্রীকে যাপন করছেন। এমন দৃঢ়চারী লোকটা আজ এমন ভেঙে পড়লেন কেন, চাইলে তো অন্যদের মতো পালিয়ে যেতে পারতেন কিন্তু যাননি।

হঠাৎ তার মোহ ভাঙে ইউনূস আলী মোল্লার কথা শুনে। তার বক্তব্য একই নৌকায় এত লোক নেয়া যাবে না। নিজাম বিষয়টা আঁচ করতে পেরে বলে—

নিয়ে নেন চাচা, তিনডা মানুষই তো বেশি হবে না।

হারামজাদা শয়তানের ঘরের শয়তান। আমি কি বুঝি না তুই ক্যান এই বাজারী মেয়েছেলে গুলারে নিতে চাস। খুব মজা তাই না?

নিজামের মাথায় প্রচণ্ড রাগ উঠলেও খুব নরম স্বরে বলতে থাকে—

বেয়াদবি নিবেন না চাচা, যুদ্ধের ময়দানে বাজারী আর সংসারী দিয়ে মানুষ মাপতে নেই। এইখানে মানুষ দুই প্রকার একটা হইলো শত্রু আরেকটা হইলো বন্ধু। এরা আমাদের বন্ধু মানুষ তা দেখলেই বোঝা যায়।

হ, শহরে যায়ে বড় বিদ্যান হইছো না?

এতক্ষণ ধরে সবকিছু অনুধাবন করতে থাকা ইউনূস আলী মোল্লার স্ত্রী এবারে মুখ খোলে—

নিজাম তো ঠিক কথাই কইছে, মানুষগুলো বিপদে পড়ছে সাথে নিলে কি হয়?

তুই চুপ থাক। আমার দশ কথার এক কথা আমি কাউরে নৌকায় নিমু না। কেউ থাকলে থাকো, না থাকলে নৌকা থেকে ভাগো।

কথাটা যে নিজামকে উদ্দেশ্য করে বলা তা আর বুঝতে বাকি থাকে না নিজামের। তাই সাথে সাথেই নিজাম নৌকা থেকে নেমে যায়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে নৌকা থেকে নেমে পরে ইউনূস আলী মোল্লার স্ত্রীও। এই দৃশ্য দেখে স্বংয় ইউনূস আলী মোল্লা কেঁপে ওঠেন। পর পর নৌকা থেকে নেমে পড়ে তার কন্যাদ্বয়। এবারে মুষরে পড়লেন তিনি। আহত সিংহের মতো গর্জে উঠে বললেন—

আমার দশ কথার এক কথা, কাউরে লাগবে না আমার।

এবারে নৌকার মাঝি পর্যন্ত তার প্রতিবাদ করে—

তাইলে চাচা আমারও দশ কথার এক কথা শোনেন আমিও নৌকায় আপনারে নিমু না। অধিকারী আপনে ওঠেন, এ ভাই আপনে ওঠেন, ও চাচি আর বুইনডি আপনারাও ওঠেন।

কথা শেষ না হতেই ইউনূস আলী মোল্লা বলেন—

আমার বায়নার টাকা ফেরত দে।

চাচা ওই কয় টাকায় যুদ্ধের বাজারে এতদূর আসছেন তাই বেশি। টাকা ফেরত চান ক্যা?

ক্যারে, আমি কি লোক পার করার ঠিকা নিছি নাকি রে?

আপনের সাথে কথা নাই, নামেন আপনে।

আহত ভাল্লুকের মতো গজরাতে গজরাতে নেমে যেতেই, অধিকারী সামনে এসে দাঁড়ায়।

আমারে ক্ষমা করবেন ভাই। আমার জন্যেই আপনাদের যাত্রার অনিষ্টি হলো, আপনারা সবাই যান নৌকায় ওঠেন।

সব ঝামেলা পাকায়ে এখন ন্যাকা সাজা হচ্ছে না। শালার তোমরা অভিনয়ও করতে জানো। তুই যা শালা। আমি আর ওই নৌকায় যামু না।

কথার উপর কথার বিনিময় আরও তীব্র হতে থাকে। একদিকে ইউনূস আলী মোল্লা আর অন্যদিকে নিজাম ও নৌকার মাঝি। অধিকারী কেবল মাঝে থেকে এই ঝামেলা থামাবার চেষ্টা করছেন। আর মেয়েরা সবাই এদের অহেতুক ঝামেলা বিরক্তিভরে দেখছে। মাঝে একবার ইউনূস আলী মোল্লার স্ত্রী তার বাহু ধরে টান দিতেই যে কটু বাক্যের তুবড়ি ছুটেছিল তাতে পরে আর কেউ সাহস করে নি। এই উত্তেজিত বাক্যালাপ যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই অনতিদূরে একটা বিকট শব্দে বোমা পড়ার আওয়াজ শোনা গেল। সাথে সাথেই মানুষের চিৎকার চ্যাঁচামেচির আওয়াজ। বিষয়টা আসলে কি হয়েছে বুঝতে প্রথমে সবাই থমকে যায়। কেবল মাঝি দৌড়ে গিয়ে নৌকায় চড়ে বসে। তারপর সবাইকে নৌকায় উঠে আসতে বলে। ইউনূস আলী মোল্লা সবার মুখের দিকে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বলে—

সবাই নৌকায় উঠে পড়েন। দেরি করলেই বিপদ হইতে পারে।

নিজাম তখন সব মেয়েদের তাগাদা দিয়ে নৌকায় তুলছিল। আর ইউনূস আলী মোল্লাকে দেখা গেল, মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা গনেশ অধিকারীর হাত ধরে নৌকার দিকে নিয়ে আসতে।

পাঠপ্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য
Showing 1 of 1
Share.

Comments are closed.