সরকারি হাউজিং এস্টেটে ফ্ল্যাট খালি হয়েছে পাড়ার কাছেই। দরখাস্তে মন্ত্রীর সই করা ‘মে বি কনসিডার্ড’ লেখা থাকলে সুবিধা হয়। খবরটা দিয়ে অফিসের আজাদ বলল, ‘দলীয় লেভেল ছাড়া আজকাল ওসব হয় না, ওসমান ভাই। সেরকম কেউ থাকলে তাকে দিয়ে মন্ত্রীকে ধরান। আছে কেউ?
অন্যসময় যেমন হয়, এখনো তেমনি, পরামর্শের শেষে প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে গেল ওসমান আলী। পঞ্চাশ পেরোবার আগেই সংসার, স্ত্রী সীমা, স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার্থী সতেরো বছরের মেয়ে দোলন এবং সদ্য মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হওয়া ছেলে সুমনকে নিয়ে ল্যাজেগোবরে হতে হতে সে বুঝে নিয়েছে খুঁটির জোর বড় জোর— টাকার খুঁটি আলগা থাকলে যে- লোক যে- কোনো কেজো মানুষকে খুঁটি ধরতে পারেনা, যে- কোনো প্রশ্নেই সে অন্ধকার দ্যাখে। এখনো দেখলো।
ওসমানকে চুপ করে থাকতে দেখে আজাদ বলল, সেবার আপনার বাড়িওয়ালা ঝামেলা করার সময় কে একজন হেল্প করেছিল বলেছিলেন। তাকে ধরুন না। সেও তো সরকারি দলের লোক বলেছিলেন?
‘বুলেট?’
হ্যাঁ, হ্যাঁ। বুলেট।
লোকাল কমিটির লোক। মাস্তানি করে বেড়ায়। পুলিশকেও হাত করে রেখেছে। পর পর এই কথাগুলো বলে একটু থামলো ওসমান। দূরের দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু ও মন্ত্রীর কী বুঝবে!
বুঝুক না বুঝুক, একটা উপায় তো বাতলে দিতে পারবে। মাস্তানেরও মাস্তান থাকে, দেখুনই না কথা বলে। এসব কথা হয় অফিস ফেরত, বাসে বসে, নিচু গলায়। আজাদের কথাগুলোকে মাথায় নিয়ে বুলেট সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতাগুলোকে একত্র করতে গিয়ে আরও চুপচাপ হলো ওসমান।
মাস ছয়েক আগে বাড়িওয়ালা আলাল শেখ তাদের উঠিয়ে দেবার জন্য ঝামেলা, শাসানি, পানির লাইন বন্ধ শুরু করলে অনেক ভেবে চিন্তে কথাটা বুলেটের কানে তুলেছিল ওসমান। পাত্তা পায়নি খুব। একটু বা তাচ্ছিল্যের গলায় বলেছিল, অতো ভয় পান কেন বলুন তো! শালা বাঙালির জাতটাই দেখছি ক্রমশ ভিতু হয়ে যাচ্ছে। কী দাদা, অ্যাঁ! আ-রে বাড়িওয়ালা ভাড়াটে এই কিচাইন চলছে সেই শেক্সপীয়রের জামানা থেকে। দিন, পাঁচশ টাকা দিয়ে যান পার্টি ফান্ডে। তারপর বাড়ি গিয়ে নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমোন।
বুলেট এমনভাবে তাকিয়েছিল যে ওসমানের মনে হয়েছিল টাকাটা তখনি বের করে না দিলে উল্টো ফল হবে— আজ রাতেই সপরিবারে বাড়িছাড়া হতে হবে তাকে। গায়ে লাগলেও, সুতরাং, দ্বিধা করেনি সে। পরের দিন অফিস থেকে ফিরে সীমার কাছে শুনলো, দুপুরে কারা যেন এসে দমাদ্দম লাথি মেরেছে বাড়িওয়ালার দরজায়, গালিগালাজ করেছে বিচ্ছিরি ভাষায়। আলাল শেখ তারপর দোতালায় এসে ক্ষমা চেয়ে গেছে সীমার কাছে।
‘শুনতে পাচ্ছ, বাথরুমে জলের শব্দ। তিনদিন পর আজ মনের সুখে গোসল করছি।’
হ্যাঁ। গোসল না করলে চলবে কেন!
অন্যমনস্ক গলায় স্ত্রীর কথার জবাব দিতে দিতে ওসমান ভেবেছিল আলাল শেখ তার চেয়ে ধনী। বছর তিনেক আগে পুলিশ ডেকে উচ্ছেদ করেছে একতলার ভাড়াটেদের— সেখানে এখন তার ক্রিম-সাবান-পাউডারের হোলসেল ব্যবসার গোডাউন। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে, কিংবা গভীররাতে, এসবের গন্ধ নাকে এলে ওসমান দেখতে পায় গ্যারেজের গায়ে ট্রাঙ্ক-সুটকেস-বাসনকোসন ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে পুলিশ, স্তম্ভিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে ভাড়াটে পরিবারের পাঁচজন। স্তম্ভিত মানুষের প্রতিক্রিয়ার দায় থাকে না, ওদেরও ছিল না। এমন কি হতে পারে যে একদিন দুপুরে তাদের দরজাতেও দমাদ্দম লাথি পড়বে? পাঁচশ টাকায় এই হলে পাঁচ হাজারে আরও কত কিছু হতে পারে। এসব ভেবে সিঁটিয়ে গিয়েছিল সে। ওসমানের আত্মমর্যাদাবোধ প্রখর। বাড়িওয়ালার ঝামেলার কথাটা আজাদকে বললেও বুলেট সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য সে চেপে গিয়েছিল খেলো হয়ে যাবার ভয়ে। বুলেটদের পার্টি ফান্ডে পঞ্চাশ টাকার বেশী চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় ছেলেগুলো যেদিন চাঁদা না নিয়েই চলে গেল দরজা থেকে, তার কয়েকদিনের মধ্যে সন্ধের পরে পাড়ার ক্লাবের সামনে প্রায় ফাঁকা রাস্তায় পেয়ে আচমকা তার পাঞ্জাবির কাঁধ চেপে ধরেছিল বুলেট। জীবনে প্রথম ভয়ের সম্মুখীন হয়ে ওসমানের মনে হচ্ছিল হাড়-মাংস আলাদা হয়ে যাচ্ছে, শীত ঢুকছে শরীরে, সম্ভবত মৃত্যুও এসে যাবে। এরপর রদ্দা মারতে গিয়েও মারেনি বুলেট। ওর নির্দেশে একটি ছেলে শুধু প্যান্টটা খোলার চেষ্টা করেছিল। বুলেট জিজ্ঞেস করল, ওর নিচের জায়গাটার নাম কি জানেন? অপমানে জবাব দেয়নি ওসমান। তখন ভারী মুখের তুলনায় ছোট চোখদুটিকে ঠান্ডা ও উদাসীন করে বুলেট বলল, কাল আবার ওরা যাবে। একশ টাকাও নয়—সাহস দেখানোর জন্য আরও পাঁচশ টাকা চাঁদা দেবেন। না হলে লোহার রড ভরে দেবো। আমার নামটা জেনে রাখুন, বুলেট মাসুদ। সবাই বুলেট বলে। লোকাল কমিটির অফিসে কিংবা ক্লাবে খোঁজ করলে পাবেন।
ছেড়ে দেবার পর হাড় মাংস এক হলেও অপমানবোধ থেকে যে— বোধটা হুহু করে ঢুকে পড়ে ওসমানের শরীরে, তার নাম ভয়। নিজের প্রতি ঘৃণাও। ওসমান উচ্চারণ না করলেও ‘পোঁদ শব্দটা নিজেই গেঁথে নেয় মাথায়। ভুলতে পারে না। বাথরুমে পেচ্ছাব করতে ঢুকে অদ্ভুত শারীরিক অস্বস্তিতে পঞ্চাশ বছরের ছা-পোষা শরীরটাকে দুমড়ে হড়হড় করে বমি করে ফেলে সে। এতোদিন ক্লান্ত হতে হতে প্রায়ই হার্ট বা সেরিব্রাল অ্যাটাক বা গ্যাসট্রিক আলসার হবার সম্ভাব্যতা নিয়ে ভেবেছে, কোনোদিন মনে হয়নি ওই বিশেষ অঙ্গটি নিয়েও চিন্তা করতে হবে। ঘটনাটা সীমাকে বলেছিল, তবে বিশেষ শব্দটা বা রড ভরে দেবার সম্ভাবনার কথা আড়াল করে। সীমার পরামর্শে পরের দিন ওরা আসার আগেই সে চলে যায় লোকাল কমিটির অফিসে। বুলেটকে দেখে ভয় ও ঘৃণা চাপতে চাপতে যতটা সম্ভব আহ্লাদিত গলায় বলে, পাঁচশই দিলাম। মানে—’
‘খুশি হয়ে দিচ্ছেন, না ভয়ে?’
না, না। খুশি হয়েই।
তাহলে ঠিক আছে। রসিদ কেটে বুলেট বলল, আমাদের কাছে বেইমানি পাবেন না। নিন। আসবেন মাঝে মাঝে।
স্ত্রীর কাছে যা আড়াল করে রাখতে হয়, বাইরের লোককেও তা বলা যায় না। বাড়িওয়ালার ঘটনারও আগে এই ঘটনা চেপে গিয়েছিল ওসমান। চেপে গিয়েছিল আরও কিছু কথা। আজাদ জানে না, এখন প্রতিমাসে সে নিয়মিত কমিটি অফিসে গিয়ে দুশ টাকা চাঁদা দিয়ে আসে। বাড়িওয়ালার শাসানি বন্ধ হবার পরে এই ধরনের লোককে বাড়িতে ডেকে আনার ব্যাপারে সীমার প্রবল আপত্তি থাকা সত্বেও একদিন বুলেটকে ডেকে সে চা আর ডাবল ডিমের অমলেট খাইয়েছিল।
দোলন অঙ্কে কাঁচা— টিউটোরিয়ালে দিয়েও উন্নতি হয়নি বিশেষ, ওকে বাড়িতে কোচিং দিয়েও পড়াবার জন্য রনজুকে প্রাইভেট টিউটর নিয়োগ করার আগে, মাখো মাখো হবার চেষ্টায় গোপনে পরামর্শ নিয়েছিল বুলেটের।পওে সীমাকে বলেছিল, বুলেটকে দিয়ে খোঁজ নেওয়ালাম। ছেলেটি ভালো। স্কুল মাষ্টারি করে সংসার চালায়। নিডি।
তমি কি দোলনের বিয়ের পাত্র খুঁজছ?
কেন?
কাকে টিউটর রাখব না রাখব সেটা আমাদের নিজেদের ব্যাপার। এতেও এই চোয়াড়ে ছোকরার সার্টিফিকেট নিতে হবে নাকি। আশ্চর্য তো!
সীমার দৃষ্টিতে সন্দেহ ক্রমশ ঘৃণায় পরিণত হচ্ছে দেখে গুটিয়ে গেল ওসমান।
সেজন্য নয়।
তবে!
বাড়িতে একটা উটকো ছোকরা আসছে। যদি এ নিয়েও কোনোদিন ঝামেলা করে। ধরো বাড়িওয়ালাই টাকা খাইয়ে কব্জা করে নেয়—লাগায়, তোমার কী হয়েছে বলো তোরু
কী হয়েছে?
নিজে বুঝতে পারছ না?
প্রশ্ন না বিস্ময় ধরতে না পেরে স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে বিভ্রান্ত বোধ করেছিল ওসমান। কিছুক্ষণ থেমে থেকে ভেবেছিল, ভয় না দেখিয়ে বুলেটের দল যদি সেদিন শেষই করে ফেলত তাকে, তাহলে এতোদিনে এই প্রশ্ন করার সুযোগ পেত না সীমা। তার মানে কি এরকমও হয় যে, জীবনদানের পরে সে বুলেটকেই ত্রাতা হিসেবে ধরে নিয়েছে? তার এবং তার পরিবারের। নাকি জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে বাঁচা সম্পর্কে সন্দেহ ঢুকিয়ে লোকটা মজা করে শুধু। এভাবে ভাবতে ভাবতে সে বলেছিল, বুঝলে তো বুঝতেই পারতাম।
সীমা বলল, এরপর তো দেখছি পাড়া ছাড়তে হবে!
যাতে না হয়, সেজন্যই। এরপরের কথাটা স্বগতোক্তির মতো ফুটে উঠেছিল ওসমানের গলায়, যাবে কোথায়?
ফ্ল্যাটের জন্য মন্ত্রীর সুপারিশের ব্যাপারে সেই বুলেটকেই ধরার কথা ওঠায় সেদিন আজাদ বাস থেকে নেমে যাবার আগে ওসমান ভাবল, সব অভিজ্ঞতার কথা সবাইকে বলতে নাই। সীমাকেও কী সব বলেছে! তারপর বলল, বলছ যখন, তখন বলে দেখতে পারি। কিন্তু বলতে গিয়ে উল্টো হবে নাতো?
উল্টো মানে?
ধরো বুলেট ব্যাপারটা জানল, তারপর আমার জন্য না করে আর কারও জন্য সুপারিশ এনে দিল। তখন কী হবে!
কী আর হবে যেমন আছেন তেমনি থাকবেন। আপনি এমনভাবে বলছেন, অ্যাজ ইফ—। কথাটা শেষ করল না আজাদ, স্টপ এসে গিয়েছিল, উঠে দাঁড়িয়ে বলল, চলি—
তারপর থেকে বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে করতে একার মনে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠল ওসমান। সে রাজনীতি বোঝে না, বাঁচা বোঝে। পঞ্চাশ বছর বয়সে পৌঁছুবার আগে কী করলে আরও ভালভাবে বাঁচা যায় তা গুলিয়ে ফেলে ক্রমশ বুঝতে পারে, যেমন আছে তেমনি থাকার মানে থেমে থাকা এবং মৃত্যুকে এগিয়ে আসতে দেওয়া। এভাবেও কী মানুষ বাঁচে!
সীমা তার চেয়ে দশ বছরের ছোট। অন্তর্নিহিত কী এক শক্তিতে তার স্ত্রী হয়েও এখনো টসকায়নি এতটুকু। আগে, অন্ধকারে সীমার শরীরে নিজেকে সেঁধিয়ে দিতে দিতে মনে হতো বয়সের ব্যবধানটা ভাগাভাগি করে নিয়েছে দুজনে। এর ফলে দোলন আসে, পরে সুমন। ফ্ল্যাট সম্পর্কিত চিন্তার মধ্যে সেদিন রাতে সীমার শরীর থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে নিতে ওসমানের মনে হয়, বুলেটের দেওয়া শাস্তির মতো দশের সঙ্গে আরও দশ জুড়ে দিয়েছে সীমা। বাড়তিটা ব্যর্থতার জন্য। অন্ধকার সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে ফ্ল্যাটের দরখাস্তে মন্ত্রীর সুপারিশ জোগাড় করে দেবার জন্য বুলেটকে ধরার পরিকল্পনাটার কথা সীমাকে বলবে ভেবেও বলে না। টের পায় ভয় আসছে; সীমা হয়ত আবারও জিজ্ঞেস করবে, তোমার কী হয়েছে বলো তো! উত্তর থাকবে না। সুতরাং, সে চেপেই গেল।
আজাদের পরামর্শ মতো পরের দিন দরখাস্ত নিয়ে বুলেটের সঙ্গে দেখা করল ওসমান। আড়ালে ডেকে যতদূর সম্ভব বিনীত হয়ে বলল, তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে, মাসুদ ভাই। মন্ত্রী যদি একটা রেকমেন্ড করে দেন—
মন্ত্রী রেকমেন্ড করলেই হয়ে যাবে?
না, মানে কিছুটা এগোনো তো যাবে।
দরখাস্তটা হাতে নিয়ে ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকল বুলেট। পাড়া ছাড়তে চাইছেন কেন? বৌদির ইচ্ছে?
না—মানে— একটু বড় জায়গা, ভাড়াও তো কম। কতোটা আর দূরে। এক কিলোমিটারও নয়—
ঠিক আছে, পরশু আসুন।
এইভাবে শুরু। হচ্ছে, হবে করে প্রায় একমাস ধরে ঘোরালো বুলেট। কোনোদিন বলে কাল আসুন, কোনোদিন পরশু। এসব বলেই গম্ভীর হয়ে যায়। চোখদুটিকে নৈর্ব্যক্তিক করে এমনভাবে তাকায় যে হিম হয়ে যায় রক্ত; আশঙ্কায় টিপটিপ করে নাভির নিচের জায়গাটা। মনে হয়, পরের কথাটা উচ্চারণ করলেই হয় চাকু না হয় রিভালবার বের করে তাক করবে বুকে। কোনো কারণে বিগড়ে গেল না তো? সেদিন হঠাৎ সীমারই ইচ্ছে কি না জিজ্ঞেস করল কেন! সে কি সীমাকেই নিয়ে আসবে একদিন, ওর অনুরোধে যদি গলে। এইভাবে চিন্তা বা দুশ্চিন্তা গুলোকে সাজাতে সাজাতে স্বাভাবিকের চেয়ে আরও একটু বিষণ্ন হয়ে ওসমান ভাবল, বিগড়ে যাবে কেন। ভিখিরির মতো মাঝেমধ্যে সামনে গিয়ে দাঁড়ানো, নিজের স্বার্থের ব্যাপার নিয়ে খোঁজখবর করা এবং যা বলছে শুনে ফিরে আসা ছাড়া ইতিমধ্যে সে এমন কিছুই করেনি যাতে বুলেট মাসুদ বিরক্ত হতে পারে। ভাবতে ভাবতে আরও বেশি মন্থর ও অন্যমনস্ক হয়ে বাড়ি ফেরে সে।এইভাবে যখন সে হবে না—ই ধরে নিয়েছে তখন সত্যি সত্যিই একদিনমন্ত্রীর সই করা চিঠিটা ওসমানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, ব্যস্ততাজনিত কারণে যা বলবার তার চেয়ে বাড়তি কোনো কথা না বলে, নতুন মোটরসাইকেল উড়িয়ে তার সামনে থেকে চলে গেল বুলেট। ওসমানের মনে হলো স্বর্গ পেয়ে গেছে হাতে।
মন ভাল থাকলে হাঁটার ধরনেও পরিবর্তন আসে ওসমানের। পঞ্চাশ বছর বয়সটাকে অনায়সে কমিয়ে আনতে পারে পঁয়ত্রিশে। প্রায় কিছুই না হওয়া সাদামাটা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া কুঁজো ভাবটা কেটে যায়, পিঠ সটান হবার সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে ফিনফিনে একটু হাসি। এসব সময় নিজের মুখ নিজে দেখতে না পেলেও অনুভূতি চিনে স্বচ্ছন্দে একটা সিগারেট ধরাতে পারে সে। বুঝতে পারে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসছে এবার।
সেদিনও সন্ধের আগে পার্টি অফিসে বুলেটের সঙ্গে দেখা করে ফেরবার সময় নিজেকে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর লাগলো তার। পার্টি ফান্ডে স্পেশাল চাঁদা বাবদ হাজার খানেক টাকা গচ্ছা গেছে যাক, আরও যাবে হয়তো, পাঞ্জাবির পকেটে ফাঁকা হয়ে যাওয়া জায়গাটা ভরে গেছে মন্ত্রীর সই করা চার ভাঁজে বন্দী দরখাস্তটা। সীমাকে দেখাবে। কাল অফিসে গিয়ে দেখাবে আজাদকে, তারপর জেরক্স করে জমা দেবে। বিশ্বাস ফেরানো এমন একটা কিছু সঙ্গে থাকলে মনে হয় না, কিছু কিছু ঘটনা এখনো ঘটে। অতো হতাশ হবার কি আছে? আশেপাশের অধিকাংশ লোক আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর হলেও সবাই কি আর সেরকম। তা যদি হতো, তাহলে বুলেটের মতো একজন ত্রাতা পেতো কোথায়!
লোকাল কমিটির অফিস থেকে ওসমানের বাড়ি পায়ে হেঁটে মিনিট সাতেক। তার আগে বড় রাস্তা থেকে বাঁক নিতে হয় ছোট রাস্তার নির্জনতায়। সেখানে থেকে সোজাসুজি চোখে পড়ে ্একটা মোটর গ্যারেজ। তার পিছনে গলি, বাড়ি। লোডশেডিং না থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তার বাড়ি ফেরার রাস্তাটা সন্ধের পর কখনোই আলোকিত থাকে না। আজও ছিল না। তবে বাড়ির আলো ঠিকই চিনতে পারে সে। কারও বিয়ে না কি উপলক্ষে যেন বাড়িওয়ালা সপরিবারে বাইরে গেছে কদিনের জন্য। তেতলা অন্ধকার থাকলেও বড় রাস্তার শেষে এসে নিজেদের আলোটা চিহ্নিত করতে ভুল হয় না তার।
ছোট রাস্তায় বাঁক নিয়ে কিছুটা এগিয়ে আজ একটা অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখল ওসমান। গ্যারেজ আর গলির মাঝখানের প্রায়ান্ধকার জায়গাটায় বড় রাস্তার দিকে দাঁড়িয়ে আছে সীমার মতো কেউ। অদ্ভুদ স্থির আর কেঠো ভঙ্গি। এর আগে কখনো এমন দৃশ্য না দেখায় বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোটানা নিয়ে আরও কয়েক পা এগিয়ে ওসমান নিশ্চিত হলো সে ভুল দেখেনি। সীমাই। তাহলে কি চাবি হারিয়ে ফেলল। বাড়িতে ঢোকার জন্য সদর দরজার তিনটি চাবি আছে তাদের, তার, সীমার আর দোলনের। কোনো কারণে তিনজনের যেকোনো দুজন বাড়িতে না থাকলে যাতে তৃতীয়জনের ঢুকতে অসুবিধা না হয়। সীমা বলেছিল আজ দুপুরে বাইরে যাবে, তার বাপের বাড়ি, সম্ভবত গিয়েও ছিল। তাহলেও দোলন স্কুল থেকে ফিরে বাড়িতে থাকবে। রনজু ওকে পড়াতে আসবে সাতটা নাগাদ। এখনো সাতটা বাজেনি। এসময় চাবি হারালে দোলনই দরজা খুলে দিতে পারে। তাহলে কি দোলন ফেরেনি এখনো।
ওসমান আবার কুঁজো হয়ে গেল। কী ব্যাপার! এখানে?
দাঁড়াও তুমি! মুখের ছায়াচ্ছন্নতা টেনে সীমা বলল, কথা আছে।
দোলন ফিরেছে?
ফিরেছে।
এখন গ্যারেজের কাজকর্ম বন্ধ। ভেতরে একটা আলো জ্বললেও সেই আলোর রশ্নি স্পর্শ করছেনা তাদের। ওসমানের ডান হাতের কব্জিটা হঠাৎ মুঠোয় চেপে ধরে, ওকে নিজের যতটা সম্ভব পাশে টেনে এনে অদ্ভুদ স্বরে সীমা বলল, মেয়ে সর্বনাশ করেছে।
আশেপাশের নৈশব্দের মধ্যে বুলেটের পুরোনো ফটফটিয়ার শব্দের মতো সীমার কথাগুলো ফাটতে লাগল মাথার মধ্যে। স্ত্রীর মুখের কঠিন রহস্যময়তার দিকে তাকিয়ে সেই মুহূর্তে উদ্ভুদ প্রশ্নটা দলা পাকিয়ে গেল ওসমান আলীর গলায়। সীমা নিজেকে সামলে নিয়েছিল। খুব চাপা গলায় বলে গেল এর পরের কথাগুলো। তিনটে নাগাদ সে বাপের বাড়ি যাবে বলে তৈরি হচ্ছিল, এমন সময় সময়ের আগেই ফিরে আসে দোলন। স্কুলের কোন পুরোনো টিচার মারা গেছে নাকি, ছুটি হয়ে গেছে আগে। সীমা ওকেও সঙ্গে নিতে চেয়েছিল, মাথা ধরেছে, ঘুমোবে বলে দোলন গেল না। পাঁচটার মধ্যেই ফিরবে জানিয়ে সীমা ্এরপর বেরিয়ে যায়। বাসেও ওঠে। বাস যখন স্টপ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, হঠাৎ রনজুকে লক্ষ্য করে রাস্তায়। প্রথমে কিছু ভাবেনি সে। আরও কিছুদূর গিয়ে মনে হলো তার তো এখন কলেজে থাকার কথা! সে বাপের বাড়ি যাচ্ছে, দোলন স্কুল থেকে ফিরে এলো, রনজুও কলেজে না গিয়ে হাটছে তাদেরই রাস্তার দিকে—একই সঙ্গে এই ব্যাপরগুলো ঘটছে কী করে! তাহলে কি আরও কিছু আছে ঘটনাগুলোর মধ্যে? সন্দেহ ও আশঙ্কায় বিচলিত হয়ে মাঝ রাস্তায় নেমে পড়ে সীমা, উল্টোদিকের বাস ধরে ফিরে আসে মিনিট কুড়ি পঁচিশের মধ্যে। দোলন বাড়িতে জেনেও সন্দেহবশত বেল দেয়নি দরজায়। নিঃশব্দে চাবি ঘুরিয়ে ভেতওে ঢুকে ঘরের পর্দা সরিয়েই হিম হয়ে যায় সে।
ধরে রাখা নিঃশ্বাসটা ছাড়ার চেষ্টায় আরও এলোমেলো করে ফেলল ওসমান। কী দেখেছ?
সেটাও বলে দিতে হবে?
বলো! স্ত্রীর বাঁ হাতটা মুচড়ে ধরে চাপা কিন্তু হিংস্র গলায় ওসমান বলল, বলতে হবে।
ওরা বিছানায় ছিল, হুঁস ছিল না। যন্ত্রণায় ঠোঁট কুঁকড়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিল সীমা। গ্যারেজ থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে খানিক তাদের দিকে আবার ঢুকে গেল ভেতরে। বড়ো রাস্তা ঘুরে একটা রিক্সা আসছে এদিকে। সেদিকে চোখ রেখে অস্বস্তি কিংবা অবিশ্বাসে মাথা নাড়ল সীমা। আগের কথার জের টেনে বলল, দেখে মনে হলো ব্যাপরটা পুরোনো। এসব একদিনেই হয় না।
কিছু বলেছে?
কে?
রনজু?
না। লজ্জায় কাঠ হয়ে গিয়েছিলাম। কী জিজ্ঞেস করব।
এই সাহস ও পেল কোত্থেকে?
সীমা জবাব দিল না। পরে বলল, আমি ওকে আসতে বারণ করেছি। মেয়েকে মেরেছি, কোনো লজ্জা নেই। বলল, রনজু ওকে ভালোবাসে। ওরা বিয়ে করবে।
তার আগে আমি ওকে খুন করব। সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে ওসমানের আগেকার চেহারা। যেসব চিন্তা থেকে আশায় ঘন করে তুলেছিল নিজেকে, হারিয়ে গেছে সব। কথাগুলো বলেই ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে সে হাটা দিল বাড়ির দিকে।
সীমা আঁচ করল কিছু ঘটতে যাচ্ছে, কিছু ঘটতে পারে। সুতরাং সেও তৎপর হলো। দোতলায় যাবার সিঁড়ির মাঝামাঝি জায়গায় পিছন থেকে টেনে ধরল ওসমানকে। তুমি কি পাগল হয়ে গেলে!
হইনি, হবো। তার আগে খুন করব ওকে। স্বামী- স্ত্রী প্রায় মুখোমুখি। সীমা হাত আলগা করেনি। ক’ মুহূর্ত ওসমানের ক্রুদ্ধ, উদভ্রান্ত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে প্রায় ধমকে বলল, এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করবে না, একটা কথাও বলবে না দোলনকে।
কেন?
এখনো অনেককিছু জানতে হবে আমাকে। মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে।
তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় সীমার গালে সপাটে একটা চড় কষালো ওসমান। এবং একই অভিব্যক্তিতে বলে উঠল, তাহলে আমাকে বললে কেন? ঘটনার আকস্মিকতায় মুখের রঙ পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে জ্বালায় ভরে উঠেছে সীমার চোখ দুটো। ওসমানকেই দেখছে। দেখতে দেখতে বেশ কিছুক্ষণ পর অন্যরকম গলায় বলল, আর কাকে বলব? ওসমান জবাব দিল না। তারপর যেন কিছুই হয়নি এইভাবে সীমার পেছনে পেছনে উঠে এলা দোতলায়। বিছানায় মাথা ঝুঁকিয়ে বসে সমূহ বোধশূন্যতার মধ্যে শুধু টের পেল— অনুভূতিটা ফিরে আসছে, টিপটিপ করছে নাভির নিচের জায়গাটা। বমিও পাচ্ছে। এসব সামলাতে তার শব্দহীন চোখদুটো ভরে উঠল জলে।
পরের দিন অফিসে আজাদ জিজ্ঞেস করল, কী ওসমান ভাই, খবর আছে কিছু?
কিসের?
একটাই তো ব্যাপার, ফ্ল্যাট। বুলেট জানাল কিছু?
না। ব্যাপারটা গুলিয়ে গেল ওসমানের মাথার মধ্যে।
আজাদ বলল, আপনাকে কেমন অন্যমনস্ক লাগছে?
কেন?
লাগছে বলেই বললাম।
চোখ তুলে আজাদের দিকে তাকানোর সাহস হলো না ওসমানের। ঠিক কোন সময়ে মনে পড়ল না, তবে কাল গভীর রাতে কোনো এক সময়ে সীমা বলেছিল ভুল তো মানুষই করে। এখন সেই কথাটাকেই আঁকড়ে ধরল সে এবং বলল, মানুষ অন্যমনস্ক থাকে না!
আজাদ সরে গেল।
ওসমান এগোতে পারল না। জায়গাটা চেনা। জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সন্দেহটাও চেনা। শুধু বুঝতে পারছে না কোনদিকে এগোবে।
টিফিনে আজাদকে একা পেয়ে গভীর থেকে উঠে এলা ওসমান। চেয়ার টেনে বসল সামনে।
কেন অন্যমনস্ক জিজ্ঞেস করছিলে? আসলে কাল একটা ব্যাপর ঘটেছে। পরের কথাটা বলবার আগে সীমা সামনে এসে দাঁড়াল। নিজেকে সংযত করে নিয়ে ওসমান বলল, পাশের বাড়িতে—
প্রশ্ন না করে আজাদ তার চোখে চোখ রাখছে দেখে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে জানালার বাইরে তাকাল ওসমান। পরিচিত দৃশ্য, নতুন কিছুই দেখল না। তখন নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে দৃষ্টিটা আবার ফিরিয়ে আনল আজাদের মুখে।
মর্যাদা গেলে মানুষের আর কি থাকে?
মর্যাদা ছাড়া আর সবকিছুই। সন্দেহগ্রস্ত হলেও জবাবে কোন দ্বিধা রাখল না আজাদ, সবই জীবন, বেঁচে থাকা, সুখ—
মর্যাদার দাম নেই?
আছে। আজাদ ঝুঁকে এলো, আপনি মনে হয় আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। কী হয়েছে বলুন তো?
ওসমান আবার পিছিয়ে এলো। দূরত্বে থেকে, সময় নিয়ে বলল, পাশের বাড়িতে আমার এক বন্ধু থাকে। তার মেয়ে। কাল বাড়ি ফিরে শুনলাম প্রাইভেট টিউটরের সঙ্গে—মানে, ওই আর কি, বুঝতে পারছ—তখন কেউ ছিল না বাড়িতে। দোষটা ওই ছোকরারই—বুঝতে পারছ—?
পারছি।
ধরা পড়ে যায়। বন্ধু খুব আপসেট। কী করবে বুঝতে পাছে না।
আজাদ চুপ করে থাকল।
ওসমান বলল আমাকে জিজ্ঞেস করছিল। তুমি বলতে পারো?
মেয়েটির বয়স কত?
ধরা পড়ার ভয়ে ওসমান বলে ফেলল, কুড়ি। তারপর দ্রুত নেমে এসে বলল, না অতো হবে না। ধরো—ম্যাক্সিমাম সতোরো—
লোকটাকে পুলিশে হ্যান্ডওভার করা উচিত।
না, না। সেটা ঠিক হবে না।
কেন?
তাহলে লোক জানাজানি হবে। কোর্টে কেস উঠবে। মেয়েটার ভবিষ্যত ঝরঝরে হয়ে যাবে।
সেটা নাও হতে পারে। নড়ে বসে আজাদ বলল, যদি সিরিয়াসলি জানতে চান, বলতে পারি। পুলিশের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারকে আমি চিনি। ছোকরাকে ধরিয়ে এনে আচ্ছা করে ধোলাই দিলে ভবিষ্যতে টিউটর সেজে আর কারও মেয়ের সর্বনাশ করার কথা ভাববে না।
ও। ওসমান ঘাবড়ে গেল হঠাৎ। সেইভাবেই বলল, আর কারও মেয়ের কী হবে না হবে তা নিয়ে আমি ভাবব কেন?
আপনি ভাববেন মানে!
ওই আর কি। বন্ধুর মেয়ে আর আমার মেয়েতে তফাত কি! অসাবধানে বলে ফেলা কথাগুলো গিলতে গিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল ওসমান। তাড়াহুড়ো করে বলল, এসব নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করো না যেন।
আজাদ জবাব দিলো না। তাকেই লক্ষ্য করছে দেখে হাতের তালুদুটো জড়ো করে নিজের মুখের ওপর চেপে ধরল ওসমান। সীমার বর্ণনায় ভুল না থাকলে গতকাল ওই সময় দোলন এবং রনজু জানত তারা কি করতে যাচ্ছে। সীমা জানত না। গতকাল এই সময়ে সে কারও কথাই ভাবেনি। ভাবছিল কিভাবে বুলেটের সমানে গিয়ে দাঁড়াবে। সই করা দরখাস্তটা হাতে পেয়েও ভাবতে পারেনি কুড়ুল পড়েছে মাথায়। এসব ভেবে তালুর আড়ালে চোখদুটো ভিজে এলো তার। মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে বলল, লক্ষ্য করেছ আমাদের জীবনটা ক্রমশ কেমন খোস-পাঁচড়ায় ভরে যাচ্ছে। মরবিড হয়ে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে বলতে পারো?
আজাদ অন্যমনস্ক, বলল না কিছ।
উঠতে উঠতে ওসমান বলল, তোমার চেনা পুলিশের কথা বলব বন্ধুকে। যদি দরকার হয়। সেদিন অন্যদিনের চেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল ওসমান। সীমা বলল, রনজু এসেছিল—
কে?
রনজু। দোলনের সাথে দেখা করতে চাইছিল। আমি দেইনি। বলেছি বাড়াবাড়ি করলে পুলিশে খবর দেব। দেলন জানে না। ও বাথরুমে ছিল।
চলে গেল?
শাসিয়ে গেল। বলল আমরা ওকে আটকাতে পারব না।
ওসমান ঘরে ঢুকল। শার্ট খুলে আলনায় ঝুলিয়ে রেখে তাকাল স্ত্রীর দিকে। কিছু বলতে গিয়েও না বলে এমন ভঙ্গিতে ধরে রাখল নিজেকে, যেন সীমার কোনো কথাই মাথায় ঢোকেনি। সীমা বলল, ভীষণ ভয় করছে। এভাবে কতদিন ধরে রাখব মেয়েকে। ওসমান এবারও সাড়া দিল না। সময় দেখে, রিস্টওয়াচটা খুলে আলমারির মাথায় রেখে বাথরুমে যাবার আগে শুধু বলল, চা করো। আমি একটু বেরুবো—
নতুন আর ঝকঝকে মোটরসাইকেল পেয়ে বুলেটের আদবকায়দা সব বদলে গেছে। লোকাল কমিটির অফিসের অদূরে ‘যুবকদল’ বোর্ড টাঙানো ক্লাবের সামনে আলাদা দাঁড়িয়ে ওসমানের কথাগুলো শুনে বলল, দাঁড়ান। আসছি।
তারপরই লাফ দিয়ে উঠে পড়ল বাইকে। মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। ভট-ভট-ভট.., বিলীয়মান একটানা গর্জনটা মাথার ভেতর থিতিয়ে যেতে ঘামতে শুরু করল ওসমান। এবং ভাবল, কাজটা কি ঠিক করলাম? প্রশ্নে দাঁড়াতে পারল না। তারপর ভাবল ভুলই বা করলাম কোথায়? সীমা নিজেই বলেছে, শাসিয়ে গেছে রনজু। আজ যখন এসেছে কালও আসবে। পুলিশে জানাবার হলে তো গতকালই জানাতে পারত। রনজু কি জানে মেয়েকে বাঁচাবার জন্য এখন ঘটনা চেপে যাবে তারা! দোলনই বা বুঝবে কি করে! আজ বাথরুমে ছিল বলে কালকেও বাথরুমে থাকবে এমন তো হতে পারেনা। যদি সেরকম কিছু ঘটে, সীমা একা সামলাতে পারবে না। তাহলে কাল থেকে অফিসে যাওয়া বন্ধ করে তাকেও বসে থাকতে হবে বাড়িতে। কতোদিন?
সীমাকে বলেনি সে বুলেটের কাছে যাচ্ছে। বললে বাধা দিত হয়ত। এখন মনে হলো স্ত্রীকে অবিশাবাস করে সে বুলেটকে বিশাবাস করল কেন? যেরকম গা ছাড়া ভাব দেখাল, আসছি বলে চলে গেল, তাতে ঘটনাটাকে গুরুত্ব দেবে কি না বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু স্ক্যান্ডাল ছড়াতে পারে। এর চেয়ে পুলিশে জানালেই কি ভাল হত, আজাদ যেমন বলেছিল?
একর পর এক প্রশ্নে নিজেকে জড়াতে জড়াতে কেই হারিয়ে ফেলল ওসমান। চেষ্টা করল শুরুতে ফিরে যেতে। কোথা থেকে কি যে হয়ে গেল। এরই মধ্যে মৃত্যুপুরীর চেহারা নিয়েছে বাড়িটা। নষ্ট হয়ে গেছে তিনটি মানুষের পারস্পারিক সম্পর্কের স্বাভাবিকতা। কাল সীমা বারণ করার পর দোলনকে কিছু বলেনি সে। দোলনও এড়িয়ে যাচ্ছে তাকে। তবে মনে হয়, তার অগোচরে কিছু একটা চলছে সীমা আর দোলনের মধ্যে। কাল নিজের ঘর থেকে বেরোয়নি দোলন। আজ অফিস থেকে ফিরে দেখল খাবার টেবিলে বসে চা খাচ্ছে—তার নিঃশব্দে চাবি খোলা ও বাড়িতে ফেরার জন্য প্রস্তুত ছিল না যেন। চোখ তুলেই এমন ভাবে নামিয়ে নিল যেন ভয় পেয়েছে। দু’এক মুহূর্তের জন্যে হলেও হঠাৎ আবেগে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল ওসমানের নিঃশ্বাস। নিজের সন্তানকে অচেনা লাগছে কেন? কাল একেই সে খুন করার ভেবেছিল, বাধা দেওয়ায় চড় মেরেছিল স্ত্রীকে, জীবনে প্রথম। চিন্তাগুলো এলোমেলো করে দিতে নিজেকে সংযত করে এরপর সে ঘরে ঢুকে সীমার মুখোমুখি হয়। কাল সীমা মেয়েকে বাঁচানোর কথা বলেছিল—বলেছিল অনেক কিছু জানা বাকি আছে। কী জানতে চেয়েছিল সীমা? ভাবনা দানা বাঁধল না। শব্দটা ফিরে আসছে আবার। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ওসমান দেখল, শিংঅলা বাইসনের ফুঁসতে ফুঁসতে ছুটে আসছে বুলেট। গায়ের লাল শার্টের সঙ্গে বাইকের রঙ আলাদা করা যায় না। একেবারে তার গায়ের ওপর এসে প্রচন্ড ব্রেক কষে দাঁড়াল।
দেখুন, দাদা, ছোঁড়াটার লাশ ফেলে দেওয়া কোনো ব্যাপর না। কিন্তু ওসবের মধ্যে এখন যাবই না। পার্টির বদনাম হতে পারে। বুলেটের দু-পা দুদিকে ছড়ানো, দু মুঠোর চাপ খেলা করছে হ্যান্ডেলে। সামান্য সন্দেহের চোখে ওসমানের দিকে তাকিয়ে বলল, ছেলেদের বলে দেব নজর রাখতে। এক মাস হসপিটালে থাকার ব্যবস্থা করে দেব। তাতেই শিক্ষা হয়ে যাবে। ব্যস, আপনার মেয়েও সেফ, আপনিও সেফ।
ঠিক আছে। তুমি যা ভালো বুঝবে। ওসমান এরই মধ্যে ভয় পেতে শুরু করেছিল। অনিশ্চিত গলায় বলল, আমি তাহলে যাই—
দাঁড়ান। বাইক থেকে নেমে এলো বুলেট, ঠিক কী করেছে বলুন তো? পেট টেট ফাঁসায়নি তো?
ক্ষমাহীন গলা। রদ্দাটা ঠিক জায়গাতেই মেরেছে। ওসমান টের পেল, এক মারেই ছড়িয়ে যাচ্ছে চিন্তাগুলো। অদ্ভুদ একটা অনুভূতিতে ছেয়ে যাচ্ছে মাথা। সেই প্রথমবার, প্যান্টের বেল্ট ধরে টান দেবার সময় যেমন হয়েছিল। কোনোরকমে নিজেকে জড়ো করে সে বলল, না, না। সেসব কিছু নয়।
আপনি ঠিক বলছেন বিশ্বাস করব কি করে?
কী বলছ! বাপ হয়ে মিথ্যা বলব!
বাপ বলেই বলবেন। মেয়েটা ওই ছোঁড়াটার সঙ্গে ঘুরত আমিও দেখেছি। আগে জানতে পারেন নি?
ওসমান চুপ করে থাকল।
শুনুন। অ্যাকশন যা নেবার আমি নেব। তার আগে আপনার মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাই। কাল পাঠিয়ে দিন ওকে। আবার বাইকে চড়তে চড়তে বলল, ঠিক আছে? কখন পাঠাবেন?
এসব করার দরকার আছে?
না করলে সেফটি কোথায়? ওই ছোঁকড়া এসই যাবে, ঝামেলা করবে।
তাহলে বাড়িতে এসো!
না। জোর দিয়ে বলল বুলেট, ভাবী আমাকে পছন্দ করে না। যে কথা বলছি শুনুন। কাল বিকেল পাঁচটায় পাঠিয়ে দেবেন আমার কাছে। কথা বলব। এখানে আমি ক্লাবেই থাকব—। না এলে মরুন শালা মেয়েকে নিয়ে।
বুলেট চলে গেল।
শব্দটা গেঁথে গেছে মাথায়। যাচ্ছে না। ভট্-ভট্-ভট। সেই একই শব্দ নিয়ে পরিচিত প্রায়ান্ধকারের মধ্যে দিয়ে বাড়ি ফিরল ওসমান। একই বিমূঢ়তা নিয়ে। এবং সীমার একা হবার অপেক্ষা করতে লাগল।
তুমি ভেবেছ কি! প্রশ্ন নয়, বিস্ময়ও নয়, ওসমানের কথা শুনে ঘৃণায় ধারালো হয়ে উঠল সীমার চোখ। স্বামীকেই দেখছে। থমকানো ভাব কাঠিয়ে বলল, আমার কি মেয়ে কি বেশ্যা যে, যে ডাকবে তার কাছেই যেতে হবে!
এসব কথা উঠছে কেন?
উঠবে— সেইজন্যই—উঠছে—।
আস্তে। ওসমান বলল, বুলেটকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। ও আমাদের অনেক উপকার করেছে—
রাখো। আমি ওকে তোমার চেয়ে বেশী চিনি।
তার মানে!
সীমা হঠাৎই গুটিয়ে নিল নিজেকে। তারপর বলল, সেবার বাড়িওয়ালার ঘটনার পর আরও একদিন এসেছিল লোকটা। তোমরা বাড়ি ছিলে না। ঝি ছিল। চা খেতে চাইল। দিলাম— পরের কথাটা বলার আগে নিঃশ্বাস নিল সীমা, আঁচল টানল বুকে। বলল, আমার হাত ধরে টেনেছিল—আমি ওকে বেরিয়ে যেতে বলি—
একটা চড় মারলে না কেন?
চড়ই মারতাম। পরে মনে হল তোমার যদি কোনো ক্ষতি করে।
ওসমান মিলিয়ে দেখল, এখন বুঝছে বুলেট কেন বলেছিল ভাবী পছন্দ করে না। ঠিক বুঝতে পারল না এই মুহূর্তে যে রাগটা আসছে, সেটা কার ওপর। সীমাকেই দেখল, আমাকে বলোনি কেন?
তোমকে! কি লাভ হত! প্রতিশোধ নিতে?
দরকার হলে নিতাম।
রাখো।
ওসমানের মনে হলো আবার ঘৃণায় ফিরে আসছে সীমা। কিছুটা পিছে হটে গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার জন্যই এইসব। খাল কেটে কুমিরটাকে তুমিই ঢুকিয়েছিলে। এখন সবাইকে গিলবে।
ওসমান জানে না এখন সে কী বলবে। ডোবার একটা ধরন আছে, অসহায়তার মধ্যে সেই ধরনটাকেই আঁকড়ে ধরল সে।
সীমা ফিরে এলা। কিছুটা শান্ত গলায় বলল, দোলনকে বুঝিয়েছি, ও ভুল বুঝতে পেরেছে। এখন কিছুদিন ও মামার বাড়িতে থাক। এখন দেখছি কাল সকালেই সরিয়ে দিতে হবে।
আমি কী করব! ওসমান বলল, না হয় বুলেটের কাছে আমরাও যেতাম ওর সঙ্গে। না গেলে আমাকেই মারবে।
অদ্ভুদ দৃষ্টিতে স্বামীকে দেখল সীমা। ঘৃণাও নয়। সময় নিয়ে বলল, যার এতো মৃত্যু ভয় তার মরাই উচিত।
পরের দিন সকালে খুব সর্তকতার সঙ্গে মেয়েকে পাচার করে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলো ওরা। ওসমান অফিসে গেল না। নিঃশব্দ থেকে নিজেকে দূরত্বে সরিয়ে রাখল সীমা। দুজনের কেউই বুঝল না কে কী ভাবছে। এবং এইভাবে সময় পেরিয়ে যেতে দিল।
বিকেল পাঁচটার পর থেকেই বুকের মধ্যে আতঙ্ক চিনতে শুরু করল ওসমান। ছ’টা বাজল, সাতটাও বেজে গেল। তখন ভাবল, বাইকের শব্দ তুলে উড়ে যাবার আগে বুলেট বলেছিল—না এলে মরুন শালা মেয়েকে নিয়ে। এমন কি হতে পারে কাল থেকে ওই কথাগুলোর যে অর্থ সে করে এসেছে তা ভুল। এমনও তো হতে পারে যে বুলেট বোঝাতে চেয়েছিল দোলনকে না পাঠালে ওসমানের মেয়ের ব্যাপাওে সে আর নাক গলাবে না, রনজু যা করার করবে। যদি তাই হয়, তাহলে সে আর বুলেটের কাছে যেতে পারবে না কখনো, কিন্তু এই আতঙ্ক থেকে বাঁচবে। এই ভেবে সীমার কাছাকাছি বিছানায় শুয়ে নতুন অনিশ্চিতিতে জড়াতে লাগল সে।
ঠিক সেই সময়ে শুনতে পেল শব্দটা। আসছে; ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ভয়ে পিঠ খাড়া করে উঠে বসল ওসমান। এবং লক্ষ্য করল সীমাও উঠে দাঁড়িয়েছে।
যদি আসে, আমই দরজা খুলব।
তুমি?
হ্যাঁ, আমি। শব্দটা নিচে এসে থামতে হঠাৎই বদলে গেল সীমার মুখের রেখাগুলো। ওসমানে দেখতে দেখতে বলল, আমাকে কিছু করার আগে ভাববে ও।
পায়ের শব্দ উঠে আসছে সিঁড়ি দিয়ে। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল ওসমান। দরজায় বেল পড়তে এগিয়ে যাবার আগে সীমা বলল, যা বলব শুনবে—, তারপর দরজা খোলার জন্য এগিয়ে গেল।
বুলেটেই। এক মুহূর্ত সীমার দিকে তাকিয়ে দূরে দাঁড়ানো ওসমানকে দেখে চাপা গলায় চেঁচিয়ে বলল, বেরিয়ে আয় শুয়োরের বাচ্চা। লাথি মরাব পেটে। দু ঘন্টা ওয়েট করিয়েছ আমাকে—খবরও দাওনি। শালা, বুলেটকে চেনোনি। সব জানি আমি। সীমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল বুলেট। সেই মুহূর্তে একটা অদ্ভুদ কান্ড করে বসল সীমা। ওর হাত চেপে ধরে বলল, চুপ করো। এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। এতো রাগ করার কি আছে?
ওসব ছেনালি রাখুন। না হলে গায়ে হাত তুলব। বুলেট হাত ছাড়িয়ে নিল। সীমা হঠাৎই আরও বেশি কওে ঘিওে ধরল বুলেটকে। বলল, বাড়িতে এসেছ, আমার সঙ্গে কথা বলো। মেয়েকে আমিই সরিয়েছি। ও কিছু জানে না। এসো বসবে এসো।
ভড়কি দেবেন না। ঘাবড়ে যাওয়া মুখে বুলেট বলল, আপনার স্বামীকে বাইরে আসতে বলুন, না হলে খুনখারাপি হয়ে যাবে এখানে।
কিচ্ছু হবে না। ও বেরিয়ে যাচ্ছে। তুমি থাকো। সীমা আবার হাত চেপে ধরল বুলেটের। ওসমানের কাছে অপ্রত্যাশিত গলায় বলল, কেন বোঝ না, তোমার ভরসাতেই তো আছি আমরা। এসো ভেতরে এসো—
ওসমান জানে সীমা এখন কী করবে। জানে, প্রতিবাদ আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু। কাল সীমার কান্না শুনেও উপলব্ধি করেনি সে সত্যিই ভয় পায় মৃত্যুকে, সীমাও তাকে মরতে দিতে চায় না। এখন বুঝে, পায়ে চটি গলিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো সে। অন্ধকার।
নিচে দাঁড়িয়ে আছে বুলেটের ফটফটিয়া। আবার যখন শব্দটা উঠবে, সে ঠিকই শুনতে পাবে। ফিরেও আসবে। আর নিশ্চয়ই সীমা তার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাবে না।
প্রচ্ছদ । সুবন্ত যায়েদ