তিনটি অণুগল্প । শিবশঙ্কর পাল

0

ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে কিছুক্ষণ আগে। আর একটু আগেও ছিল ঘরে-বাইরে ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার, একেবারে গাঢ় কালো অন্ধকার। একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক অন্ধকারকে করেছিল গভীর থেকে গভীরতর। যেন জনম জনমের অন্ধকার। বিকেল থেকে অরুণ ঘরে বিছানায় মগ্ন ছিল একটা উপন্যাসে। পড়াটা ছিল তার শেষের দিকে, পৃষ্ঠা চার/পাঁচ আছে বাকি। একটানে শেষ করা গেল না…। দরজাটা হাট করে খোলা, ঘরে কেরোসিনের বাতির কালিতে ঝুল হবে ভেবে অরুণ বাতিটা ঘরের বাইরে একেবারে দরজার সামনে রেখেছে, যেন আলোটা বাইরেও পড়ে আবার ঘরের ভেতরেও আসে এবং তাতে ঘরও কালি না হয়। এছাড়া বাতির তেমন কোনও কাজ নেই। বাইরে মাঝে মাঝে ছোট ছোট বাতাস ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে, আলোর শিখাটা নড়ে নড়ে উঠছে তাতে। বাতিটা আবার বাতাসে যেন না নিভে যায়—আর এ ব্যাপারটাতে অরুণের আশংকা থাকছে সবসময়। বাতাসে কেরোসিনের খোলা বাতি একবার নিভু নিভু করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। অরুণ বিছানায় বসে সেই বাতির বাঁচা-মরা দেখছে। একবার বাতাস গায়ে লাগছে তো—এই যাই যাই অবস্থা, আবার বাতাস ফের থামলে—এই বেঁচে উঠলাম অবস্থা। বাতি যখন বাতাসের দমকায় এই যাই যাই অবস্থা তখন আচমকা অরুণের বুকটা ধক ধক করে উঠছে। আবার যখন বাতি বীরদর্পে জ্বলে উঠছে তখন যেন অরুণের প্রাণ ফিরে আসছে।
একবার—দুইবার—তিনবার, কতক্ষণ এ বিরক্তি সহ্য করা যায়! অরুণের মনে এই কেরোসিনের বাতির মরা-বাঁচা খেলা অসহ্য মনে হল। ‘ধুর ছাই’, বলে বাতিটা নেভাতে গেল। ফুঁ দিবে বলে গাল ভর্তি বাতাস নিয়ে আচমকা থেমে গেল সে। কিছুক্ষণ অবস্থা বুঝে শূন্যে বাতাস ছুঁড়ে দিল ও। জ্বলন্ত বাতিটা দরজার পাশে দেয়ালের আড়ালে ঠেলে দিয়ে শান্তমনে ঘরে ফিরে এলো।
মনে-প্রাণে এবার অনেকটা স্বস্তিবোধ করল অরুণ। বাঁচা গেল, এই বিরক্তি আর কতক্ষণ ভালো লাগে!

চার রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানটায় ওরা তিনজন আড্ডাটা বেশ ভালই জমিয়ে তুলেছিল। কথার ফাঁকে ফাঁকে সিগারেট পাফ, সেই সাথে চায়ের কাপে চুমুক। ওদের গল্পের বিষয় ছিল হাল আমলের রাজনীতি, পাড়ার কোন মোড়ল বেশি বাড়াবাড়ি করছে, কাকে ঠ্যাঙ্গানো দরকার, কে কে মাসোহারা দিতে আপত্তি করছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কথা প্রসঙ্গে মেয়েদের বুকে কে কেমন করে হাত দিয়েছিল সে প্রসঙ্গটা উঠতেই মাঝ-বয়সি কিছু শ্রোতা সুরসুর করে দোকান ছাড়ল। দোকানে ছিল আর দু’জন বৃদ্ধ। তাদের কানে যুবকত্রয়ের কথা যাচ্ছিল কি না তা বোঝা মুশকিল। কারণ, তারা দোকানের খোলা অংশের দিক দিয়ে তাকিয়ে একমনে অলস ভঙ্গিতে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল।

আচমকা দোকানের পর্দা ঠেলে এক যুবক আসতেই তিনজন চুপ মেরে গেল। আগন্তুক যুবক বেশ অস্থিরতার সাথে অন্য টেবিল থেকে একটা চেয়ার টেনে বসল। চোখে মুখে অস্থিরতার ভাব স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আগন্তক যুবক সিগারেট চাইল ওদের কাছে। তিনজনের একজন বিনীতভাবে জানাল তার কাছে সিগারেট নাই। তার পর বাকি দু’জনেরও একই জবাব। শেষের জন কথা শেষ করার আগেই আচমকা আক্রমণের শিকার হল। আচমকা আক্রমণে বাকি দু’জনের বিষ্ময়ের সীমা থাকল না। শেষের জনের জামার কলার টেনে ধরেছে আগন্তুক যুবক, ‘অই শালা বেশ্যার ব্যাটা নাই কি জন্যি? এ্যাহ নাই কি জন্যি?’

বাকি দু’জন ততক্ষণে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়েছে। দু’জনের হাত চলে গেল জামার নিচে কোমরে। একটা ক্ষুর মুহূর্তের মধ্যে আগন্তক যুবকটার মুখমণ্ডল ফালা ফালা করে ফেলল, আর একটা চকচকে ছুরি নির্বিঘ্নে ঢুকে গেল হৃদপিণ্ড বরাবর!

সিমেন্টের শান বাঁধানো হিমশীতল ঠান্ডা টেবিলে লাশটা শোয়ানো আছে। মুখের কাপড় তোলাই হয়নি এখনও। এই কিছুক্ষণ আগে সেটা রেখে গেছে হাসপাতালের কর্মচারীরা। খুব তাড়াতাড়িই লাশের ময়না তদন্ত হবে। সে-কথা মতিলাল ডোমকে জানানোও হয়েছে। মতিলাল মর্গের আশপাশেই ঘুর ঘুর করছে। লাশের আত্মীয়-স্বজন এখান-সেখানে ঘোরাফেরা করছে। ছেলেরা এরই মধ্যে শোক কাটিয়ে উঠলেও মেয়েরা তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনও। হাসপাতালের দেয়ালে শরীরটাকে ঠেস দিয়ে একে অন্যকে জড়াজড়ি করে কান্নাকাটি করছে। মতিলালের এতে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। শত শত এমন দৃশ্য সে দেখেছে। সবকিছু সহ্য হয়ে গেছে তার। তাছাড়া সে তো ডোম, তার দুই হাত দিয়েই কতো লাশ চিড়ে ফেলেছে তার হিসাব নেই। একটু পরে এটাও তাকেই চিড়ে ফেলতে হবে। মেয়েটা নাকি বিষ খেয়েছে।

মতিলাল মর্গে ঢুকে মুখের কাপড়টা তুলেই চমকে ওঠে। বাকি কাপড় আর তার তোলার কথা মনে থাকে না। মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়েই পাথর হয়ে যায়। ‘এক্কেবারে চাঁন্দের লাকান মুখ!’ —মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে শব্দ কয়টা বের হয়ে আসে তার। একেবারে সাক্ষাৎ দেবী! মতিলালের বুকটা কেমন জানি এক অজানা হাহাকারে হুহু করে ওঠে। কী হয়েছিল মেয়েটার? সংসারে এমন কী ঘটনা ঘটেছিল যে বিষ খেতে হলো তাকে? কাঁধ থেকে মাথাটা পুরো চোখ বুলিয়ে মতিলাল হাত নাড়তে পারে না। সাক্ষাৎ দেবীকে সে ছোঁবে কিভাবে? নিখুঁত মুখমণ্ডল ঠিকরে বের হচ্ছে যেন আলোক রশ্মি। সিঁথির সিঁদুর মুছে যায়নি এখনও। জ্বল জ্বল করছে সিঁদুর।

মর্গের লাশ কেটে মতিলালের হাত পেকেছে সেই অনেক আগেই। এই প্রথম কোনও লাশের জন্য তার হাহাকারে ফেটে যাচ্ছে হৃদয়টা। অথচ একটু পরেই বুকটা লম্বালম্বি চিড়ে মাথাটা দু-ফাঁক করে ফেলতে হবে তাকেই।

পাঠপ্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য
Share.

Comments are closed.