লাইফ সাপোর্ট
যাপিত জীবনের পাতায় পাতায় লেগে থাকে সাবধানে চলার অনুশাসন। তারপরও অসাবধানতার ঢেউয়ে টালমাটাল হয়ে যায় জীবন তরী। কিন্তু এমনও ঢেউ আছে যার তোড়ে ভেসে যাবার প্রার্থনা নিঃসঙ্কোচে বাসা বাধে মনের অন্দরে। রোদ তখন খানিকটা দাঁতাল। আর খানিকটা মাতাল, মেঘ মিতালীর দেখা না পেয়ে। দিন পনেরো হলো হাসপাতাল ছাড়া। কার্ডিওলজিস্ট বলে দিয়েছেন সাবধানে চলাফেরা করতে। তাই রোদের তীব্রতা বেশি হলেই খুঁজতে হয় একটু নিরাপদ আশ্রয়। বিধায় লক্ষ্মীপুরের এই চায়ের দোকানে বসা। মনু ভাই, দুধ চা না রঙ চা? ফ্ল্যাটের প্রতিবেশি এ কথা বলতেই সাগ্রহে পাশে বসালাম। নাহ্ , রং চাই খাই। তিনি কোনো আপত্তি করলেন না। শুধু বললেন, খাওয়াতে কি আসে যায়, সম্পর্কটাই আসল কথা। আরে ভাই সেটিই তো থাকছে না। হাত ফসকে পড়ে যাওয়া চিনেমাটির থালার মত ভেঙে যাচ্ছে। এখন আবার কি হলো? কিচ্ছু নাহ্, এমন হতাশার বাতাস বুক থেকে বেরোতেই লোকটার মুখ থেকে খুলে পড়লো সত্তর বছরের অপ্রাপ্তি। যৌবনে ছেড়ে গেল মালতি, বয়সকালে ছেলে-মেয়ে আর শেষ বিকেলের ম্লান রোদে প্রাণের স্ত্রী। এসব ছাড়াই আপনি তো ভাই আপনার হার্ট নিয়ে ভালোই আছেন। দুজনেই হো হো করে হাসতে হাসতে একজন হঠাৎই থেমে যায়। আর লোকে বলাবলি করে মনু মিয়ার আপন কেউ ছিলো না, ওই লাইফ সাপোর্ট ছাড়া।
কাঁটা
ধুর শালা, খ্যাড়ের ব্যাড়ে পা চলতিই চাহাছে না। ওই মুকা, আর কদ্দুররে? দ্যাখ্ য্যাতে য্যাতে যদি কুন্ঠে ঠ্যাক লিয়্যা হদিস হারা হয়্যা য্যাস্ তাহিলে কিন্তু খবর আছে। শালার জাইতনাশা মিয়্যামানুষ, যদি আইজ ধরতে পারি তাহিলে অখে ভাত ছুটাবোই ছুটাবো। দ্যাখো হবি ভাই, অতো মাথা গরম ক্যইরো নাখো। মুকাম্মেল ওরফে মুকা মিয়ার এমন কথা শুনে হবি মেম্বার কিছুটা শান্ত হয়। আর জোরে জোরে পা চালায়।
বিড়ালের মত খুব সন্তর্পণে পা ফেলে শিকারের দিকে তারা এগিয়ে যায়। মনে হয় যেন চোর ধরবে। একটু করে যুগিপাড়ার শেষ বাড়িটার পিছনে যেয়ে তারা থেমে যায়। আশ্রয় নেয় একটা কলার মাদে। কিন্তু না কমেলার কোনো দ্যাখা পায় না। ও বাড়ির কাইমুদ্দি একাই ঘর থেকে বের হয়ে আসে। মুকার মাথায় একটা চাটি মেরে, শালার মুকা-সব সময় ভুল খবর দিস্! চল্। বাড়িতে এসে দ্যাখে কমেলা খুব স্বাভাবিক, ও তুমি আইস্যাছো, গোসুলধড়ি কর্যা খায়্যা ল্যাও। ক্যানে তুই খাবি ন্যা? আমি কালাইয়ের বড়ি দিবার লাগ্যা নামুপাড়ায় ভাত্যা কুমড়্যাহ আইনতে যাবো। স্বামীকে বলে কমেলা নামুপাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিছুক্ষণ থেমে থেকে হবি মেম্বারও কমেলার পিছু নেয়। আর গিয়ে থামে সন্দেহ করা ওই বাড়িটার ঠিক পিছনে। এবার কলার মাদে নয় বরং একেবারে কাশছনে ছাউয়া বেড়ার কোল ঘেষে। -ইস্, শালার মশা, সবগুলানয্যান পোয়াতি ধানের শীষ। ক্যামুন ঠ্যাপা ঠ্যাপা। এ গা-গতর আর কঞ্চির টাটিতে লাগ্যা আছে ক্যামুন। যাউগ্গা, কপাল অ্যাতো ঘাইমছে ক্যানে, ও বাবা দেখছিগুল্ল্যা বাহ্যা রক্তও বারাহ্ছে, অ্যাঁ পায়ে যে কাঁটালোট্যা ঢুক্যাছে !
বেথুলদি
বাড়িতে খোলামেলা কথা বলার উপায় নেই। বাবা খুব রাগী। একটুতেই রেগে যান। তাই সারাদিন বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা ছাড়া কোনো বিকল্প খুঁজে পাই না। তবে হ্যাঁ, বাবা তো আর সব সময় বাড়িতে থাকেন না। সকালে যখন বাজারে যান কিংবা বিকেলে দুধের বোতল হাতে ঘোষপাড়ার দিকে, তখন মনে হয় প্রাণে প্রাণ ফিরে এলো। মা’র কাছেই যতো আবদার, এবার পরীক্ষা শেষে দু’সপ্তাহ নানার বাড়ি থাকবো, এই বলে দিলাম। আচ্ছা, এই বলে মাথা নেড়ে মা থেমে যান। কিন্তু মামা এসে বললেন এবার আমরা চাঁইপাড়ার বেথুলদি’র বাড়ি যাবো। হ্যাঁ মামা, যে প্রতিদিন সবজি বিক্রি করতে আসে তার কথা কথা বলছো। ঠিক ধরেছিস। এবার পড়ায় মন দে। চোখের পলকে সময় চলে যায়। পড়া এড়ানো সেই আমি এখন জোহা হলে থাকি। ফাইন আর্টসে এবার ফাইনাল দিবো। এক এক করে এতোগুলা পরীক্ষা শেষ হলো অথচ সেই বেথুলদি’র বাড়ি আজও যাওয়া হলো না। তবে এবার মনে মনে পণ করেছি, যাবোই। নব্বই দশকের শেষের দিকে। ফাইনাল হতে আর মাত্র দু’মাস বাকি। রাতে হলের ডাইনিংয়ে প্লেটটা হাতে করে তাতে একটু লবণ ঘষে নিচ্ছি এমন সময়, ওই শুনেছিস কালকে হল খালি করতে হবে। পুলিশ রেইড দিলো, দুই’শ দুইয়ে দুইটা লোহার রড আর চারে একটা রামদা-কুড়াল পেলো। বলিস কি ! হ্যাঁ, তাই তৈরি হয়ে নে। তাহলে পরীক্ষা! জীবন থাকলে তবেই না পরীক্ষা। সেই রাতেই হল ছাড়লাম। পাশের একটা মেসে খুব কষ্টে পড়া-শোনা করে ফাইনালি পরীক্ষা শেষ করলাম। এখন অফুরন্ত সময় এই ভাবতেই বাড়ি থেকে মেসের ঠিকানায় চিঠি এলো, মাস্টার্স্ শেষ করেছো এবার বিসিএস’র প্রস্তুত্তি নাও। চিঠি পেয়ে তো আমি হতভম্ব। বাবা বলে কি! কিন্তু খুশির খবর হলো মামা আমার মেসে চলে এসেছে। ওই যে বেথুলদি’র বাড়ি যেতে হবে। মামা, আজ রাতটা থেকে তবে কাল ওখানে রওনা দিলেই হবে। আজ রাতে তোমার কাছে তার অনেক গল্প শুনবো। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বেথুলদি’র বয়স পঁচাশির কোঠায়। অথচ এতো বছর জীবনে কথনো নাকি ভাত মুখে তুলেননি। তিন বেলা রুটি খেয়ে দিন কাটান। আর সবজি বেচে যা আয় হয় তা নাকি অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেন। কিন্তু এর রহস্য কি মামা? না, ডাক্তারও ভাতের রহস্য ভেদ করতে পারেনি। বেথুলদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাদের আক্রমণে আহতদের সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলো। তাই এমন বীর সৈনিকের সাথে সাক্ষাৎ করা একটা আনন্দের ব্যাপার। এখন ঘুমিয়ে পড়। সকালে পেপারওয়ালা ডাকলো, পেপার হাতে নিতেই মাথাটা কেমন ঘুরে গেল…মুক্তিযুদ্ধের সাহসী বীর বেথুলদি…। পরীক্ষা শেষে ভ্রমণের স্বপ্ন আমাদের অপূর্ণই থেকে গেল।
প্রচ্ছদ । অর্ণব পাল সন্তু