গতিপথ
তারা বলছিল, যখন তাদের আমি পড়িয়েছি বেশ ক’বছর আগে, তখন তারা সম্পর্কে জড়িয়েছিল। তারা কখনো চায় নাই যে, তারা আলাদা হয়ে বাঁচুক! কিন্তু প্রেম যে চিরন্তন নয় এই সত্যটুকু তারা নাকি জেনে গেছে। জেনে গেছে তারা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে এবং এখন তাদের ভেতরে বিচ্ছেদের সুর বেজে উঠেছে। তবুও, কোনো এক সূত্র ধরে যদি সম্পর্ক ধরে রাখা যায়, সে প্রত্যাশা নিয়ে তারা আমার কাছে এসেছে।
তাদের এমন বালসুলভ আচরণ দেখে আমার কিঞ্চিত রাগ হলো। এতো ভনিতা করে এক হওয়ার কোনো মানে হয় না। কিন্তু তাদের আবার মিলিয়ে দিতেও ইচ্ছে হচ্ছিলো আমার! কিন্তু কী করে মেলাবো আর, কোনো বুদ্ধি আমার মাথায় ছিল না।
তখন কিংবা তারও আগে সন্ধ্যা নেমেছিল। আমি টের পেলাম মূলত ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে ঘরভর্তি অন্ধকার ঢেলে পড়লে। আসলে বাইরে তখন আবহাওয়া বিরূপ। তুমুল ঝড়-বৃষ্টি আর বিদ্যুত চমকাচ্ছে! গাছের টুকরো ডাল জানালায় এসে আছড়ে পড়ছে। তখন হঠাৎ, আমি ফুঁসে উঠলাম ভীষণ। চট করে পকেট থেকে রিভালবার বের করে তাক করলাম তাদের মাথার দিকে।
ভীষণ চিৎকার করলাম, বেরোও, এক্ষুনি।
ওরা ত্রস্তমুখে বেরিয়ে গেল সে তুমুল অন্ধকারে, ঝড়ের রাতে। আমি দরজায় এগিয়ে এসে তাদের চলে যাওয়া দেখতে চাইলাম। কিন্তু কুটকুটে অন্ধকার ঝড়ের রাত। চোখে পড়লো না। কিন্তু আমি দরজা ছাড়লাম না একটি দৃশ্য দেখার নেশায়। প্রকৃতি আমায় সে সুযোগ করে দিল।
দেখলাম বিদ্যুত চমকের আলোয়, অনেকটা দূরে তারা ভীষণ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে তুমুল ঝড়ের ভেতরে।
আমার কী যে ভালো লাগলো!
চিৎকার দিলাম তাদের দিকে মুখ করে। বললাম, সংকট ও সংগ্রাম মানুষকে গতিপথে এনে ছেড়ে দেয়!
মৌসুমি ঝড়
একটি জনপদের কথা জানা হলো।
সে জনপদে মৌসুমি ফলের সবচেয়ে ভালো সময়টাতে এক বা একাধিক ঝড় আসতো। আর তাতে প্রচুর ফল ঝরে যেতো। ডাল ভেঙে পড়তো। পৈত্রিক ধারণা থেকেই তারা মনে করতো, প্রকৃতি ভীষণ নিষ্ঠুর ও অবিবেচক। তারা বলতো, এতো ফল দেবার অর্থ কি যখন উদ্দেশ্য থাকে ঝরিয়ে ফেলার। তারচে বরং ফল না আসুক, তাতে স্বপ্ন আসবে না এবং স্বপ্নভঙ্গের বেদনাও পেতে হবে না।
তবু ঝড় তো আসতো, আর তারা প্রকৃতিকে রীতিমতো গালমন্দ করতো। কিন্তু তারা প্রতিবার প্রার্থনাও করতো ঝড় না আসার। প্রকৃতিও তার সৌন্দর্য দেখিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলো একবার, এইভাবে যে, সেবার ফলের মৌসুমে কোনো ঝড় এলো না। গাছের ডাল ভরে উঠলো ফুলে-ফলে। সে মৌসুমে সকলেই ভীষণ কৃতজ্ঞ হয়ে উঠলো। কিন্তু ফল ক্রমশ পরিপক্ক হতে হতে এতো ভারী হয়ে এলো যে, ফল বহন করা সকল ডাল প্রায় ভেঙে গেল। ক্রমশ শূন্য হয়ে উঠলো বাগানগুলো! তখন তাদের মন এতোটাই ভেঙে পড়লো যে, তারাও ফলভরা একেকটা ডালের মতো লুটিয়ে পড়লো বেদনায়। আর ফিরে যেতে চাইলো পেছনে, ফলের ভরা মৌসুমে কোনো ঝড়ের দিনে।
আদর
কোন ধরনের মেয়েদেরকে তাদের স্বামীরা বেশি আদর করে, জানেন?
নাহ, বলুন তো।
এটা আমাদের ছোটোদের ধারণা ছিল। যখন আমরা স্কুলে ছিলাম এবং আমাদের বুক ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠছিল, তেমন এক বয়সে আমরা কয়েকজন মেয়ে এমন এক আলাপ তুলেছিলাম, কার স্বামী অধিক আদর দেবে?
এই বলে আমরা সবাই নাক দেখাদেখি করছিলাম। কারণ নাক ঘামলে নাকি স্বামী সোহাগ বেশি জোটে। তখন আমাদের সকলেরই কমবেশি নাক ঘামা আছে বলে লজ্জায় লাল হচ্ছিলাম।
তারপর কী ঘটলো জানেন?
কী?
আমাদের ভেতরে, ঠিক ভেতরেও না, আমাদের পেছনে থেকে এসব দেখছিলো একটা মেয়ে, যাকে আমরা নিগ্রো বলে ডাকতাম। কারণ তার চোখ ছিল ট্যারা এবং হাঁটতো খুঁড়িয়ে, গায়ের রঙ কিঞ্চিৎ নিগ্রোদের মতোই। আমরা খেয়াল করে দেখলাম, তার নাক সবচেয়ে বেশি ঘেমে আছে এবং রোদ্দুরের ঝলকে মুক্তোর মতো জ্বলছে। আমরা খুব মন খারাপ করলাম এবং তাকে হিংসা করতে শুরু করলাম।
তারপর কী হলো? সে অধিক আদর পেয়েছে?
তার বিয়েই হয় নাই। তাকে কেউ বিয়ে করতে চায় নাই।
এখনো কি তার নাক ঘামে? বিয়ে হলে আদর সে এখনো পেতে পারে। নাকি?
সে সুযোগ নাই। মৃত্যুর আগে, যখন কোনো পাত্রই তাকে পছন্দ করছিলো না, একদিন বিলাপ করে (জীবন-যন্ত্রণার বিবিধ আক্ষেপে) বলেছিল, কবর-ই তার সোয়ামি এবং দ্রুতই সে তার সোয়ামির কাছে যেতে চায়।
তারপর?
তার দুদিন পরেই সে তার সোয়ামীর কাছে চলে গেল।
প্রচ্ছদ । অর্ণব পাল সন্তু