বাস্তু-উদ্বাস্তু
—আসলে যেটা ঘটেছিল: রুদ্রর কবিতার মতো, দুর্যোগের শিকার একটা কাক ঊড়ে এসে বসল—যেখানে মুখ হা করা একটা নারীমূর্তি অথবা পাথর হয়ে যাওয়া কোনও যুবতী অবস্থান করছিল, তার মুখের হা-টা ছিল অবিকল বিট্রিশ আমলের তালাগুলোর চাবির গর্তের মতো, কাকটি সেই নারী অথবা যুবতীর শোভন পোশাক ঠোকরাতে ঠোকরাতে ফালা-ফালা করে অশ্লীল করে ফেলল—
—ফ্ল্যাশব্যাক—
আদিতে উপত্যকাটা আসলে চড়ুইদের ছিল, সেখানে পোকায় আক্রান্ত একটা কাক আশ্রয় নেয়, তার গায়ে থাকা পোকারা চড়ুইদের খাদ্য ছিল, তারা সেগুলো খেয়ে কাকটিকে সুস্থ্ করে তোলে; কাকটি চড়ুইদের শুভকামনা জানিয়ে ফিরে যায় কিন্তু কিছুদিন পর ঝাঁকে ঝাঁকে আরও অনেক পোকায় আক্রান্ত কাকেরা চড়ুইদের আবাসে এসে তাদের হুকুম দেয় পোকামুক্ত করতে, চড়ুইরা কাকেদের দাসে পরিণত হলো, কাকেরা সুস্থ্ হলো, চড়ুইদের আবাসস্থল তাদের ভালো লেগে গেল,
ফলাফল: চড়ুইরা উদ্বাস্ত হলো—
—চড়ুইদের ভেতর যারা হো-চির দরবারে গিয়েছিল তারা অপরাধী হিসেবে গণ্য হলো, কেননা চড়ুই প্রচুর শস্য খেয়ে ফেলে, হো-চি চড়ুইদের নিধনের আদেশ দিলেন,
ফলাফল: খাদ্য সংকট—
হো- চি চড়ুইদের খুঁজতে লাগল অন্যদিকে চড়ুইদের অভাবে কাকেরা পুনরায় পোকাদের দ্বারা আক্রান্ত হলো, তারাও চড়ুইদের খুঁজছে।
ভুক-পতঙ্গ
আজাদ হিন্দ্ ফৌজের প্রবেশের আশঙ্কায় দেশে কাল্পনিক দুর্ভিক্ষ চলছে। পরিসংখ্যান বলছে ৪৩ লক্ষ ভুখা মানুষ ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যতো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এই সংখ্যা তার চেয়েও ছয়গুন গুণ বেশি। আলু ব্যাপারী কালু খাঁর ধারণা, মানুষ না খেয়ে কখনো মারা যায়নি। মরেছে বেশি বেশি খেয়ে। কমরেড মোল্লা মোহাম্মদ হবিবুল্লাহ্ বলেন, মানুষ খাদ্যের অভাব কখনো মরে না, মরে খাদ্যের সুষম বণ্টনের অভাবে।
১৩৫০ বঙ্গাব্দের ১২ জৈষ্ঠ্য জোতদার আফতাব হোসেন জোয়ারদার না খেয়ে মারা গেলেন, অগাধ টাকা-পয়সা আর তার বাড়িতে প্রচুর খাদ্য-শস্য মজুত থাকা সত্বেও। কারণ, জোয়ার্দারের হ জ ম শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে।
সদাই
বাজারে হঠাৎ ব্যাপক দরপতন। চাল, তেল, চিনি, মাছ, মাংস, সবজি সব সস্তা। আমদানিও এন্তার। বাজারে তুমুল হট্টগোল। যে যা পারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সদাইয়ের প্রতিযোগিতা লাগিয়েছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনছে সবাই। মানুষ এত বাজার করছে যেন বাজার রাখার জায়গা নেই। বাজার করে টাকা শেষ হচ্ছে না। মন্তাজ মিয়াও বাজার করতে এসেছে। ব্যাগে হয়নি রীতিমত বস্তা ভরা বাজার মাথায় নিয়ে টালমাটাল করছে। বহুকাল পর খাসি কিনেছে আজ। সবাই মিলে মাংস ভাত খাবে চেটেপুটে। তার ছোট্ট পরিটার চেহারাটা ভেসে উঠে চোখে। তার জন্য সুগন্ধী তেল আর চুলের ব্যান্ড কিনেছে। এতদিনে নিজেকে ধনী মনে হচ্ছে।
বাবা! বাবা!…
পা হারিয়ে রিকশাওয়ালা মন্তাজ মিয়া তিনদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। একটা টাকাও নেই। ওষুধের দাম শুনে মূর্ছা বিলাসে সদাই করছিল।
প্রচ্ছদ । অর্ণব পাল সন্তু